মুসলমানের আদব বা শিষ্টাচার



রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতের জন্য আদব তথা শিষ্টাচারের সকল দিকগুলোই বর্ণনা দিয়েছেন। এমনকি যুদ্ধের ময়দানের শিষ্টাচার কি হবে, তাও বলে দিয়েছেন। তিনি তাদেরকে যুদ্ধের সময় নারী-শিশু এবং যে সকল বৃদ্ধ যুদ্ধ করে না তাদেরকে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। বারণ করেছেন গির্জা ও আশ্রমে আশ্রয় গ্রহণকারী পাদ্রী, ধর্মযাজক ও সন্নাসী এবং শষ্যক্ষেত্রে চাষাবাদরত চাষীকে হত্যা করতে। এবং মৃতের দেহ বিকৃত করতে ও নিষেধ করেছেন। এমনিভাবে আরো অনেক আদব রয়েছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বলে দেয়া শিষ্টাচার তথা আদবের মধ্যে রয়েছে খাদ্য-পানীয় গ্রহণ, পোষাক-পরিচ্ছদ, নিদ্রা, স্ত্রী মিলন ও দাম্পত্য জীবনের আদব ছাড়াও অনেক বিষয়। এমনকি তিনি পায়খানায় প্রবেশের আদব ও বলে দিয়েছেন, যেমন: 
সালমান ফারেসী (রাঃ) থেকে বর্ণনা এসেছে, তিনি বলেন, 'মুশরিকরা আমাদেরকে বলে, এ কেমন কথা তোমাদের নবী তোমাদেরকে সকল কিছুই শিক্ষা দেন, এমনকি পায়খানা করার নিয়মও ?! তিনি বললেন, 'হ্যাঁ! তিনি আমাদেরকে পায়খানা -পেশাবের সময় কেবলা মূখী অথবা কেবলাকে পিছনে দিয়ে বসতে বারণ করেছেন। ডান হাতে ঢিলা- কুলুখ ব্যবহার, তিনটির কম পাথর ঢিলা হিসাবে ব্যবহার অথবা হাড় কিংবা গোবর দিয়ে ঢিলা ব্যবহার থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।' মুসলিম

ইসলামই হচ্ছে একমাত্র জীবন ব্যবস্থা যা সমগ্র মানব জীবনের জন্য একটি নির্ভুল পদ্ধতি এঁকে দিয়েছে। যার মাঝে রয়েছে জীবনের প্রতিটি স্তর ও বিভাগের সুষ্ঠু সমাধান। এটা মানব রচিত কোন জীবন বিধান নয় যে, তার মাঝে সত্য মিথ্যার সম্ভাবনা থাকবে, বরং এটা হচ্ছে আল্লাহ প্রদত্ত জীবন বিধান, যা তার অনুসারীদের জন্য দুনিয়ার জীবনে বয়ে নিয়ে আসে কল্যাণ, শান্ত্তি ও মানুষিক স্বস্তি, আর কিয়ামতের কঠিন দিনে পুরস্কৃত করে তার চিরস্থায়ী সুখের জান্নাত। 
আল্লাহ বলেন- 
"আমরা কিতাবে (কুরআনে) কোন কিছুই বাদ দেইনি।"[ সূরা আনআম ৩৮ আয়াত ]

আত্মার সুষ্ঠু গঠন ও পরিশুদ্ধি এবং সুন্দর চরিত্র বিনির্মাণে নবুওয়তী আদবের একটি সুন্দর প্রভাব ও সুদূর প্রসারী ফলাফল রয়েছে। নবুওয়তী আদব তথা ইসলামী শিষ্টাচার জাতির জন্য এমন কিছু ধারাবাহিক প্রজন্ম উপহার দিয়েছে, সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা, চারিত্রিক নিষ্কুলুষতা, পবিত্রতা, আদল ইনসাফ, ব্যক্তিত্ব, লজ্জাশীলতা, দয়া দাক্ষিণ্য এবং শক্তি-সামর্থ ও বীরত্বে যাদের তুলনা ইতিহাসে বিরল। হতাশাগ্রস্থ মজলুমের সহযোগিতায় ও তাদের জুড়ি নেই। ইসলামী শিষ্টাচার ও নবুয়তী চরিত্র থেকে দূরে সরে যাওয়াই হচ্ছে বর্তমান মুসলিম উম্মার দুর্বলতার কারণ। মুসলিম উম্মাহ যদি অপর জাতির দাস সূলভ অনুসরণ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে, যদি ফিরে আসে তাদের সক্বীয়তা এবং সত্যিকার ইসলামী শিষ্টাচারের দিকে, তাহলে অবশ্যই তাদের হারানো গৌরব, সম্মান ও মর্যাদা ফিরে আসবে। মুসলিম জাতি কি এ ব্যাপারটি অনুধাবন করবে ?

আমরা সামনের পৃষ্ঠাগুলোতে আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং দ্বীনের সাথে মুসলিমের আদব সম্পর্কে জানতে পারবো, জানতে পারবো তার নিজের সাথে এবং প্রতিবেশীদের সাথে তার আচরণবিধি এমনকি অমুসলিম ও অন্যান্য জীব-জন্তুর সাথে ও তাদের আচরণ কেমন হওয়া উচিৎ, সে সম্পর্কে জানতে পারবো।

১. নিয়তের আদব

প্রতিটি মুসলিমই অবগত যে, নিয়তের একটি অসাধারণ গুরুত্ব রয়েছে। নিয়তের বিশুদ্ধতার উপর নির্ভর করে কাজের গ্রহণযোগ্যতা। নিয়ত শুদ্ধ না হলে আমল তথা কাজও বাতিল হয়ে যায়। নিয়ত হচ্ছে কোন কাজের জন্য প্রগাঢ় ইচ্ছা পোষণ। যখন এই ইচ্ছাটা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর আদেশ পালনার্থে হয়, তখনই তা হয় বিশুদ্ধ এবং এর থেকে বেরিয়ে আসে উত্তম ও গ্রহণযোগ্য আমল। যখন এই নিয়ত হবে দুনিয়ার জন্য, অথবা মানুষের প্রশংসা ও বাহবা অর্জনের জন্য, অথবা খ্যাতির জন্য অথবা আলোকিত বিশ্বে নিজেকে প্রকাশ করার জন্য অথবা অপর কোন অসৎ উদ্দেশ্যের জন্য, তখন নিয়তও বাতিল হয়ে যাবে এবং তার ফলে অগ্রহণযোগ্য ও বাতিল যোগ্য কাজই বের হবে। 
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
"নিশ্চয়্‌ই সকল আমলই নিয়তের উপর নির্ভরশীল। আর প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য সেটাই রয়েছে যার জন্য সে নিয়ত করেছে।" বুখারী ও মুসলিম

২. আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সাথে শিষ্টাচার

১. একজন মুসলিম এটা ভালভাবে অবগত যে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনই তাকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই তাকে রিযিক দিয়েছেন, তিনিই তাকে সকল নিআমাত দিয়েছেন এবং তার উপর থেকে সকল প্রকার কষ্ট বিদূরিত করেছেন। সুতরাং তাকে অবশ্যই তার রবের সাথে সর্বোচ্চ শিষ্টাচার প্রদর্শন করতে হবে।
২. আল্লাহর সাথে শিষ্টাচারের অন্যতম একটি দিক হলো- তাঁর শরীয়তের পরিপূর্ণ অনুসরণ, আর তা হবে আদিষ্ট বিষয়াবলী পালন এবং নিষেধকৃত বিষয়াবলী বর্জনের মাধ্যমে।
৩. আল্লাহর সাথে আদবের মধ্যে শরীয়ত বিধৃত কোন কাজের বিপক্ষে যুক্তি পেশ করা থেকে বিরত থাকা। 
আল্লাহ বলেন,
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ
"কোন মুমিন পুরুষ কিংবা নারীর উচিৎ নয় আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের দেয়া ফায়সালার উপর নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।" সূরা আল-আহযাব : ৩৬
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরো বলেন:
إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَنْ يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا
"মুমিনদের কথাতো এমনই হবে যে, যখনই তাদের মধ্যকার কোন ফায়সালার জন্য তাদেরকে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের দিকে আহ্বান করা হবে, তখন তারা বলবে: শুনলাম এবং মানলাম।" সূরা-নূর-৫১

আল্লাহর সাথে আদব রক্ষার অপর একটি দিক হলো- তার নেআ'মাতের শুকরিয়া আদায় করা এবং তার স্তুতি করা, তাঁকে বেশী বেশী স্মরণ করা এবং অধিক পরিমাণে দো'আ করা এবং তাঁর সকল কাজেই তাঁর কাছে আশ্রয় গ্রহণ করা, তাঁকে ভালবাসা, তাঁর সম্পর্কে সুধারণা পোষণ করা, তাঁর শাস্তিকে ভয় করা, তাঁর কাছে সওয়াব তথা পূণ্যের আশা করা, তাঁর মহান কিতাব পবিত্র কোরআন অধিক তেলাওয়াত করা, সকল প্রকার কবিরা ও সগীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা।

৩. কোরআনের সাথে আদব বা শিষ্টাচার

একজন মুসলিম আল্লাহ তাআ'লার কিতাব কোরআনে কারীমের সাথে ও আদব রক্ষা করে চলবে, উহাকে সম্মান করবে, সকল কথার উপর এ কালামকে প্রাধান্য দিবে। এমনিভাবে সে কোরআনে বর্ণিত বিভিন্ন আহকাম, আদব ও আখলাক অনুসরণ করে চলবে। কোরআন তেলাওয়াতের সময় নিম্নোক্ত বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখবে।
১. পরিপূর্ণ পবিত্রতার সাথে, কিবলার দিকে বসে অত্যন্ত সম্মানের সাথে তেলাওয়াত করা।
২. কোরআনের আয়াত এবং তার অর্থ নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা করা।
৩. শুধু জানা বা আমলের জন্য নয় বরং ইবাদতের নিয়তে তেলাওয়াত করা।
৪. অত্যন্ত ধীরে তারতীল সহকারে তেলাওয়াত করা, তাড়াহুড়া না করা।
৫. স্বতন্ত্র আহকাম হিসেবে কোরআন তেলাওয়াতের ও অধ্যয়নের নিয়ম শিক্ষা করা।
৬. সুন্দর স্বরে তেলাওয়াত করা এবং কিতাবের মর্যাদা বিবেচনায় বিনম্র ও ভদ্রভাব তথা খুশু ও খুজু বজায় রাখা।

৪. রাসূল(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাথে শিষ্টাচার

একজন মুসলিম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথেও যথোচিৎ আদব রক্ষা করবে। কেননা তিনিই হলেন সর্বশেষ নবী, যাকে আল্লাহ তা'আলা মানব জাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসার জন্য প্রেরণ করেছেন। রাসুূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে আদব রক্ষা করার দিকগুলো হলোঃ
১. তার আদেশের অনুগত হওয়া, এবং তিনি যে সকল কাজ থেকে নিষধ করেছেন এবং ধমকি দিয়েছেন, সেগুলো থেকে বিরত থাকা।
২. অপরিহার্যভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালবাসা।
৩. তাঁর সুন্নাতের অনুগত হওয়া এবং আদব আখলাক তথা শিষ্টাচারে তাঁরই মত হওয়া।
৪. তাঁর আনিত বিধান জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা করা, বিশেষ করে যে কোন বিবাদের ক্ষেত্রে। 
আল্লাহ বলেন:
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
"কক্ষণও নয়, আপনার রবের কসম, তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তাদের বিবাদমান বিষয়ে আপনাকে বিচারক মানবে, এবং আপনার দেয়া ফয়সালার ব্যাপারে তাদের অন্তরে কোন খুঁত পাবে না, এবং সে ফায়সালা সন্তুষ্টচিওে মেনে নেবে।" সূরা আন -নিসা: ৬৪
৫. তাঁর অনুগামী, সাহাবী ও বন্ধুদেরকে ভালবাসা এবং তাদের শত্রুদেরকে ঘৃণা করা।

৫. স্বীয় আত্মার সাথে শিষ্টাচার

১. একজন মুসলিম সর্বদা মনে মনে হিতোপদেশ এবং শিষ্টাচারের দিকগুলো স্মরণ করবে, যাতে করে পবিত্র ও উন্নত রাখতে পারে তার নফসকে।ইনজ আত্নাকে প্রবৃত্তির ও লালসার পেছনে ছেড়ে দিবে না, যাতে সে স্খলিত হয়ে যায় এবং অন্যায় করে। যারা নিজেদের নফসের হিসাব নিজেরা রাখে এবং নফসের তদারকি করে, তাদের প্রশংসায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا ﴿৯﴾ وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا ﴿১০﴾
"সেই সফলকাম যে নফসকে পরিশুদ্ধ করেছে,আর সেই ক্ষতিগ্রস্ত যে আত্মাকে কলুষিত করেছে।" সূরা- আশ-শামস্‌ : ৯,১০
২. মুসলিম মা'সুম তথা বেগুনাহ নয়, বরং সে কখনো কখনো ভ্রান্তি ও গুনাহে লিপ্ত হয়ে যায় কিন্তু মুসলিম হিসেবে তাকে নফসের সাথে জিহাদ করতে হবে, যাতে সে অবাধ্য গুনাহগার হয়ে না যায়। যদি ও কখনো তার আত্মা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন গুনাহে লিপ্ত হয়ে যায়, তাহলে সে মুষড়ে পড়বে না। সে হতাশ হবে না। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেনা। বরং সে আল্লাহর দরবারে ফিরে আসবে এবং দ্রুত তওবা করবে এবং গুনাহের জন্য তাঁর নফসকে ভর্ৎসনা করবে। সম্ভব হলে নফসকে অনুমোদিত খাহেশ থেকেও বিরত রাখতে হবে, যাতে করে সে পরবর্তিতে কোন গুনাহের নির্দ্দেশনা দিতে না পারে।

মনে রাখা দরকার, তওবা তিনটি জিনিসকে শামিল করে:
• গুনাহ থেকে ফিরে আসা।
• গুনার কাজের জন্য অনুশোচনা।
• কৃতগুনাহের দিকে ভবিষ্যতে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত।
যখন মুসলিম সত্যিকারার্থে তওবা করে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন, তার গুনাহ ক্ষমা করে দেন, তার মন্দ কাজগুলো মিটিয়ে দেন তিনি বলেন :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحًا عَسَى رَبُّكُمْ أَنْ يُكَفِّرَ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيُدْخِلَكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ
"হে মুমিনগণ! তোমরা খালেসভাবে আল্লাহর কাছে তওবা কর সম্ভবত তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ মোচন করে দিবেন এবং তোমাদেরকে দাখিল করবেন জান্নাতে যার তলদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত।" সূরা আত তাহরীম: ৮

৬. মানুষের সাথে শিষ্টাচার

একজন মুসলিম তার কথা-বার্তা, চাল-চলন, আচার আচরণে মানুষের সাথে শিষ্টাচার প্রদর্শন করবে। কেননা স্তর বা মর্যাদার বিবেচনায় প্রতি শ্রেণীর মানুষেরই পৃথক আদব তথা শিষ্টাচার রয়েছে। মানুষের সাথে আচার-আচরণে শিষ্টাচার প্রদর্শনের প্রকৃতি ও নমুনা নিম্নরূপ হওয়া উচিৎ :
১) মুসলিম তার পিতা-মাতার সাথে সর্বক্ষেত্রে আনুগত্য প্রদর্শন করবে, তবে আল্লাহর অবাধ্যতায় নয়। সে তাদেরকে সমীহ করবে, মর্যাদা দেবে, এবং তাদের অনুগত থাকবে। কথা-কাজে তাদেরকে সম্মান দেখাবে। তাদের সাথে কর্কশ আওয়াজে কথা বলবেনা। তাদের উপরে নিজের আওয়াজকে উচুঁ করবে না। তাদেরকে নাম ধরে ডাকবে না, বরং তাদেরকে সম্বোধন করবে সম্মানজনক শব্দে। তাদের প্রতি যথোচিৎ ইহসান-সুন্দর আচরণ করবে, এবং তাদের প্রয়োজনে তাদের জন্য অর্থ ব্যয় করবে।
২) মুসলিম মাত্রই একথা জানে যে তার সন্তানদের উপর তার কিছু কর্তব্য রয়েছে যেমন: তাদের জন্য স্ত্রী নির্বাচন করা, যারা তাদের সন্তানদের মা হবে, আর সন্তানদের প্রতি পিতার কর্তব্য হচ্ছে তাদেরকে উওম লালন-পালন, শিক্ষা প্রশিক্ষণ, এবং তাদের ব্যয়ভার গ্রহণ করা এবং তাদের প্রতি কোমল আচরণ করা, এটা তারা উপযুক্ত হয়ে কর্মক্ষম হওয়া পর্যন্ত।
৩) আর মুসলমান স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার পারস্পরিক শিষ্টাচার এর স্বীকৃতি দিবে।
আর এটা এমন কয়েকটি দায়িত্ব যা প্রত্যেকের সাথে সংশ্লিষ্ট। যেমন, আল-কুরআনের বাণীঃ
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ
"নারীদের উপর যেমন পুরুষদের ন্যায় সংগত অধিকার রয়েছে তেমনি অধিকার রয়েছে নারীদের স্বামীদের উপরও। তবে পুরুষদের অধিকার স্ত্রীদের উপর বেশী।" সূরা আল- বাকারাহ ২২৮ আয়াত

আর ইসলাম ধর্ম স্বামীকে তার স্ত্রীর সাথে নিম্নলিখিত শিষ্টাচার বজায় রাখতে নির্দেশ দিয়েছে:

ক. ধৈর্যশীলতা এবং কোমল আচরণ: যেমন, 
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: 
"তোমরা মহিলাদের কল্যাণ কামনা করবে। কেননা তাদেরকে পাজর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। যদি পাজরের কোন একটি বেকে যায় তাহলে এটা আরো চওড়া হয়ে যাবে। তুমি এটাকে সোজা করতে চাইলে ভেঙ্গে যাবে। আর তুমি এটাকে ছেড়ে দিলে সর্বদাই বাকা থাকবে। সুতরাং মহিলাদের ক্ষেত্রে কল্যাণ কামনা কর।" বুখারী ও মুসলিম
খ. ন্যায় সংগতভাবে তার ভরণ পোষণের ব্যবস্থা করা: 
এটা ইসলাম ধর্ম স্বামীর উপর ওয়াজিব করে দিয়েছে।
গ. তার সাথে সদাচরণ করা: 
যেহেতু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 
"তোমাদের সেই ব্যক্তি উত্তম যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।" আহমাদ এবং তিরমিযী
ঘ. তাকে ভালবাসা এবং ঘৃণা না করা: 
যেহেতু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী: 
"কোন মুমিন স্বামী যেন কোন মুমিন স্ত্রীকে পৃথক না করে। যদি সে তার কোন একটি আচরণ অপছন্দ করে তাহলে অপর একটি আচরণ তার পছন্দ হবে।" মুসলিম
ঙ. ন্যায় বিচার করা এবং অত্যাচার না করা।
চ.অশ্লীল কর্ম হতে পবিত্রকরণ এবং উপভোগের অধিকার দেয়া।
ছ. তার গোপনীয় কথা প্রকাশ করা হারাম।
জ. তার পদস্খলন ও দোষ ত্রুটি খুঁজে বের করা হারাম।
ঝ. তাকে শিক্ষা দেয়া এবং সৎকাজের আদেশ করা ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা।
ঞ. তার সাথে খেলা করা এবং তাকে ভালবাসা।
যেমনিভাবে, 
আয়েশা (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে কোন এক ভ্রমনে বের হলাম। তখন আমি ছোট বয়সী ছিলাম, মেদবহুল ছিলাম না, ভারী বা মোটা ছিলাম না। অতঃপর তিনি লোকজনকে বললেন, "তোমরা অগ্রসর হও।" অত:পর তারা অগ্রসর হলো। অত:পর আমাকে বললেন: "এদিকে আস। আমি তোমার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করব তারপর আমি তার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করলাম। এ্‌বং আমি বিজয়ী হলাম। তখন তিনি চুপ হয়ে গেলেন। অত:পর যখন আমার মেদ বেড়ে গেল, আমি মোটা হয়ে গেলাম এবং পূর্বের ঘটনা ভুলে গিয়েছিলাম তখন আমি তাঁর সাথে কোন এক ভ্রমণে বের হলাম। তিনি মানুষকে বললেন, "তোমরা অগ্রসর হও।" তারা অগ্রসর হয়ে গেল। পরে আমাকে বললেন, আয়েশা তুমি এসো আমি তোমার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করবো। দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করে তিনি বিজয়ী হলেন। তারপর তিনি হাসতে লাগলেন এবং বললেন, "এটি প্রথমবার তোমার বিজয়ের প্রতিশোধ।" -আহমাদ,আবু দাউদ
ইনিই হচ্ছেন ইসলাম ধর্মের নবী এবং এটাই তার স্ত্রীর সাথে আচরণ।
৪. মুসলিম ব্যক্তি তার নিকট আত্মীয় ও রক্ত সম্পর্কীয় লোকদের সাথে ভদ্র সুলভ আচরণ করবে। তারা আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্ন করলেও সে আত্মীয়তা বজায় রাখবে। তারা তাকে বিরক্ত করলেও সে তাদের সাথে সদাচরণ করবে। তারা তার সাথে দুর্ব্যবহার করলে সে তাদের সাথে সৎ ব্যবহার করবে।
সে তাদের বড়দের সম্মান করবে এবং ছোটদের স্নেহ করবে। তাদের রোগীদের সেবা করবে এবং তাদের বিপদগ্রস্থ লোকদেরকে সমবেদনা জানাবে। এবং তাদের বিপদ আপদে এগিয়ে আসবে। 
কেননা আল্লাহর বাণী:
وَآَتِ ذَا الْقُرْبَى حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ
"আত্মীয়কে তার অধিকার দিয়ে দাও এবং মিসকীন ও পথিককে....।" সূরা আল ইসরা : ২৬
৫. ইসলাম প্রতিবেশীদের হক নির্ধারণ করে দিয়েছে যেমনিভাবে নিকটাত্মীয়দের অধিকার আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে।
এগুলো হচ্ছে, তাদের সাথে কথায় কাজে সদাচরণ করা এবং তাদেরকে কষ্ট না দেয়া এবং তাদের ক্ষতি হবে এমন কোন বিষয়ে জড়িত না হওয়া। তাদের সম্মান করা, সাক্ষাতে হাসিমুখে কথা বলা, তাদের খোজ খবর নেয়া, তাদেরকে উপহার দেয়া এবং তাদের মূল্যায়ন করা। ঠাট্টা-বিদ্রুপ না করা যেমন: 
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 
"জিবরীল সর্বদাই আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে অসিয়ত করতেন এমনকি আমি ধারণা করলাম যে, তিনি অচিরেই তাকে [প্রতিবেশীকে] উত্তরসূরী করে দিবেন।" বুখারী ও মুসলিম
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন, 
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে সে যেন তার প্রতিবেশীকে সম্মান করে।" বুখারী ও মুসলিম

৭. একজন মুসলমানের অপর মুসলমানের উপর হক বা অধিকার

এক মুসলমানের উপর অপর মুসলমানের প্রতি অনেক অধিকার রয়েছে, যেমন
১. যখন তার সাথে দেখা করবে তখন তাকে সালাম দিবে এবং সে সালাম দিলে তার সালামের উত্তর দিবে, আর ইসলামের অভিবাদনের নিয়ম হচ্ছে: "আস্‌সালামু আলাইকুম"
২. যখন সে হাঁচি দিবে তখন তার হাঁচির জবাব দিবে, যখন হাঁচি দাতা হাঁচির পরে 'আলহামদুলিল্লাহ' (প্রশংসা আল্লাহর) বলবে তখন তার হাঁচির জবাব হচ্ছে, 'ইয়ারহামুকালল্লাহ' (আল্লাহ আপনাকে দয়া করুন) আবার হাঁচি দাতা তার প্রতি উত্তরে বলবে: 'ইয়াহ্‌দি কুমুল্লাহু ওয়া ইয়ুসলিহু বা-লাকুম'। (আল্লাহ আপনাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন ও আপনার বিষয়াদি সুন্দর করে দিন)
৩. অপর ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করবে যা নিজের জন্য পছন্দ করে।
৪. সে তার মুসলমান ভাইয়ের সাহায্য করবে। এবং তাকে লাঞ্ছিত বা অসম্মান করবে না। যেখানে সে তার সাহায্য-সহযোগিতা দরকার সেখানে তাকে সাহায্য করবে।
৫. যে কোন ব্যাপারে পরামর্শ চাইলে সুপরামর্শ দিবে।
৬. রুগ্ন হলে তার সেবা করবে বা দেখা করবে এবং মারা গেলে তার দাফন কাফন ও জানাযাতে অংশ গ্রহণ করবে।
৭. তার সাথে বিনয়ী আচরণ করবে। কখনও অহংকারী হবে না।
৮. তার গীবত বা পিছনে নিন্দা করবে না। তাকে তুচ্ছ জ্ঞান করবে না। তাকে উপহাস করবে না। তার দোষ ত্রুটি খুঁজে বের করবে না। তার প্রতি কোন ধরনের অপবাদ দিবে না। তাকে ধোকা দেবে না, প্রতারণা করবে না। তাকে গালি দেবে না। তাকে হিংসা ও ঘৃণা করবে না। তার প্রতি মন্দ ধারণা করবে না। তার গোপনীয় বিষয় জানার জন্য গোয়েন্দাগীরি করবে না। তার সাথে খিয়ানাত করবে না এবং তিন দিনের বেশী তার সাথে রাগ করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখবে না।
৯. তার পদস্খলন বা ত্রুটি ক্ষমা করবে। তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবে। তার পিছনেও তার সম্মান রক্ষা করবে। তার প্রতি ন্যায় বিচার করবে এবং তার সাথে এমন আচরণই করবে যা সে পছন্দ করে। সে বড় হলে শ্রদ্ধা করবে। ছোট হলে স্নেহ করবে। সাহায্যের প্রয়োজন হলে তাকে সাহায্য করবে।

৮. অমুসলিমদের সাথে শিষ্টাচার

যে আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি কুফুরী করে তাকে মুসলমান ঘৃণা করবে, তার প্রতি বন্ধুত্বপোষণ করবে না তাকে ভালবাসবে না। অনুরূপভাবে তার কুফুরীতে সে সন্তুষ্ট হবে না এবং তাকে কুফুরী মেনে নেবে না।
এতদসত্বেও সে তার প্রতি অত্যাচার করবে না। বরং তার সাথে ন্যায়পরায়ণতা দেখাবে ও ইনসাফ করবে। অনুরূপভাবে সে তার মাল, জীবন ও সম্মানের ক্ষেত্রে আঘাত হানবে না। তাকে কষ্ট দেবে না, যদি সে মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে জড়িত না থাকে।
এমনিভাবে সে তার সাথে সাধারণত: দয়া ও করুণা দেখাবে। যেমন: ক্ষুধার্থ হলে তাকে খাওয়াবে, পিপাসিত হলে পান করাবে, রুগ্ন হলে সেবা করবে, তাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করবে। যেমন, 
রাসূল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 
"করুনাশীলদেরই রাহমান [দয়াময় আল্লাহ] করুনা করেন। তোমরা যমীনবাসীদের উপর করুণা কর। তাহলে আকাশবাসী তোমাদের উপর করুণা করবেন।"-আহমাদ
এমনিভাবে অমুসলিমদের উপঢৌকন দেয়া ও তার উপহার গ্রহণ করা ও তার খাবার গ্রহণ করা জায়েয যদি সে আহলে কিতাব (ইহুদী বা খৃষ্টান) হয়।
এগুলো মুসলমানের চরিত্র এবং শিষ্টাচার তার ধর্ম বিরোধী লোকেদের সাথে। তাহলে তার মুসলমান ভাইয়ের সাথে তার আচরণ কেমন হওয়া উচিৎ ?

৯. জীবজন্তুর অধিকার

জীব-জন্তুর অধিকার প্রতিষ্ঠায় স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় শত শত বৎসর পূর্বেই ইসলাম জীবজন্তুর জন্য অধিকার নিরূপণ করেছে। তম্মধ্যে :
১. ক্ষুধায় ও পিপাসায় খাদ্য ও পানীয় প্রদান।
২. তার প্রতি দয়া ও মহানুভবতা দেখানো এবং তার কষ্ট হয় এমন ব্যবহার না করা।
৩. হত্যা বা যবেহ করার সময় তাকে কষ্ট না দেয়া। কেননা: 
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 
"নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক সকল জিনিসের প্রতি সদাচারণ করাকে ফরয করে দিয়েছেন। অতএব যখন তোমরা হত্যা করবে তখন সুন্দর পন্থায় হত্যা করবে। আর যখন যবেহ করবে কখন সুন্দর করে যবেহ করবে। তোমাদের কেউ যেন তার ছুরিকে ধার দিয়ে নেয় এবং পশুকে প্রশান্তি দেয়।" মুসলিম
৪. তাকে কোন প্রকার শাস্তি দেবে না। চাই তা বুভুক্ষু রাখার মাধ্যমে হোক বা প্রহার করে হোক অথবা তার দ্বারা অসম্ভব এমন বোঝা বহন করে হোক অথবা তার অংগচ্ছেদ করে অথবা তাকে আগুনে পুড়িয়ে কষ্ট দেয়া হোক। সবগুলোই ইসলামে নিষিদ্ধ। 
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 
"এক মহিলা একটা বিড়ালকে কষ্ট দেয়ার কারণে দোযখে প্রবেশ করেছে, সে তাকে আটকিয়ে মেরেছিলো তাকে খেতে দেয়নি তাকে পানীয় পান করতে দেয়নি, এমনকি তাকে ছেড়েও দেয়নি যাতে সে যমীনের ঘাস খেতে পারত।" বুখারী ও মুসলিম

মুসলমানের চারিত্রিক গুণাবলী


ইসলামী শরীয়ত হচ্ছে একটি পরিপূর্ণ জীবন পদ্ধতি যা সকল দিক থেকে সার্বিকভাবে মুসলমানের ব্যক্তিগত জীবনকে গঠন করার ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছে এসব দিকের মধ্যে গুনাবলি শিষ্টাচার ও চরিত্রের দিকটি অন্যতম। ইসলাম এদিকে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছে। তাইতো আকীদা ও আখলাকের মাঝে সম্পর্ক স্থাপন করে দিয়েছে, যেমন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, 
"মুমিনদের মধ্যে পরিপূর্ণ ঈমানদার হচ্ছে সে ব্যক্তি, যে তাদের মধ্যে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী।" [আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযি ]

সুতরাং উত্তম চরিত্র হচ্ছে ঈমানের প্রমাণবাহী ও প্রতিফলন। চরিত্র ব্যতীত ঈমান প্রতিফলিত হয় না বরং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সংবাদ দিয়েছেন যে, তাঁকে প্রেরণের অন্যতম মহান উদ্দেশ্য হচ্ছে চরিত্রের উত্তম দিকসমূহ পরিপূর্ণ করে দেয়া। 
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, 
"আমি তো কেবল চরিত্রের উত্তম দিকসমূহ পরিপূর্ণ করে দিতে প্রেরিত হয়েছি।" ইমাম আহমাদ ও ইমাম বুখারী আদাবুল মুফরাদে বর্ণনা করেছেন। 

এ কারণেই আল্লাহ তাআলা উত্তম ও সুন্দরতম চরিত্রের মাধ্যমে তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রশংসা করেছেন। 
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِنَّكَ لَعَلى خُلُقٍ عَظِيمٍ
"নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত।" [সূরা আল কালাম : ৪]

কোথায় এ চরিত্র বর্তমান বস্তুবাদী মতবাদ ও মানবতাবাদী মানুষের মনগড়া চিন্তা চেতনায়? 
যেখানে চরিত্রের দিককে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করা হয়েছে, তা শুধু সুবিদাবাদী নীতিমালা ও বস্তুবাদী স্বার্থের উপর প্রতিষ্ঠিত। যদিও তা অন্যদের উপর জুলুম বা নির্যাতনের মাধ্যমে হয়। অন্য সব জাতির সম্পদ লুন্ঠন ও মানুষের সম্মান হানীর মাধ্যমে অর্জিত হয়।
একজন মুসলমানের উপর তার আচার-আচরণে আল্লাহর সাথে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে, অন্য মানুষের সাথে, এমনকি নিজের সাথে কি ধরনের আচরণ করা উচিত ইসলাম তার এক অভিনব চকমপ্রদ চিত্র অংকন করে দিয়েছে। যখনই একজন মুসলমান বাস্তবে ও তার লেনদেনে ইসলামী চরিত্রের অনুসরণ করে তখনই সে অভিষ্ট পরিপূর্ণতার অতি নিকটে পৌঁছে যায়, যা তাকে আরো বেশি আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও উচ্চ মর্যাদার সোপানে উন্নীত হতে সহযোগিতা করে। পক্ষান্তরে, যখনই একজন মুসলমান ইসলামের চরিত্র ও শিষ্টাচার হতে দূরে সরে যায় সে বাস্তবে ইসলামের প্রকৃত প্রাণ চাঞ্চল্য, নিয়ম-নীতির ভিত্তি হতে দূরে সরে যায়। সে যান্ত্রিক মানুষের মত হয়ে যায়, যার কোন অনুভূতি এবং আত্মা নেই।

ইসলামে ইবাদতসমূহ চরিত্রের সাথে কঠোরভাবে সংযুক্ত: 
যে কোন ইবাদত একটি উত্তম চরিত্রের প্রতিফলন ঘটায় না তার কোন মূল্য নেই। আল্লাহর সামনে নামায আদায়ের ক্ষেত্রে দেখা যায় নামায একজন মানুষকে অশ্লীল অপছন্দ কাজসমূহ হতে রক্ষা করে, আত্মশুদ্ধি ও আত্মার উন্নতি সাধনে এর প্রভাব রয়েছে। 
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ
"নিশ্চয়ই নামায অশ্লীল, অপছন্দনীয় কাজ হতে নিষেধ করে।" [ সূরা আল-আনকাবুত :৪৫ ]

অনুরূপভাবে রোযা তাক্কওয়ার দিকে নিয়ে যায়। আর তাক্বওয়া হচ্ছে মহান চরিত্রের অন্যতম, যেমন- 
আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
"হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে যেমনি ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর যাতে তোমরা তাক্বওয়া লাভ করতে পার।" [ সূরা আল বাকারা : ১৮৩ ]

রোযা: অনুরূপভাবে শিষ্টাচার, ধীরস্থিরতা, প্রশান্তি, ক্ষমা, মুর্খদের থেকে বিমুখতা ইত্যাদির প্রতিফলন ঘটায়। 
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, 
"তোমাদের কারো রোযার দিন যদি হয়, তাহলে সে যেন অশ্লীল কথাবার্তা না বলে, হৈ চৈ না করে অস্থিরতা না দেখায়। যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা তার সাথে লড়াই করে সে যেন বলে দেয় আমি রোযাদার। বুখারী ও মুসলিম

যাকাত: অনুরূপভাবে অন্তরকে পবিত্র করে, আত্মাকে পরিমার্জিত করে এবং তাকে কৃপণতা, লোভ ও অহংকারের ব্যধি হতে মুক্ত করে। 
আল্লাহ তাআলা বলেন,
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا
"তাদের সম্পদ হতে আপনি সাদকাহ গ্রহণ করুন যার মাধ্যমে আপনি তাদেরকে পবিত্র ও পরিমার্জিত করবেন।"
[ সূরা তাওবাহ ১০৩ আয়াত ]

হজ্জ: আর হজ্জ হচ্ছে একটি বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণশালা আত্মশুদ্ধি এবং হিংসা বিদ্ধেষ ও পঙ্কিলতা থেকে আত্মাকে পরিশুদ্ধি ও পরিমার্জনের জন্য।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَمَنْ فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِي الْحَجِّ
"যে এ মাস গুলোতে নিজের উপর হজ্জ ফরয করে নিল সে যেন অশ্লীলতা, পাপাচার ও ঝগড়া বিবাদ হজ্জের মধ্যে না করে।" সূরা আল বাকারাহ : ১৯৭

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, 
"যে ব্যক্তি অশ্লীল কথা-বার্তা ও পাপ কর্ম না করে হজ্জ পালন করল, সে তার পাপ রাশি হতে তার মা যেদিন জন্ম দিয়েছে সে দিনের মত নিষ্পাপ হয়ে ফিরে এল।" বুখারী ও মুসলিম।

ইসলামী চরিত্রের মৌলিক বিষয়সমূহ

১. সত্যবাদিতা
আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের যে সকল ইসলামী চরিত্রের নির্দেশ দিয়েছেন, তার অন্যতম হচ্ছে সত্যবাদিতার চরিত্র। 
আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ
"হে ঈমানদারগণ আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমরা সত্যবাদীদের সাথী হও।" সূরা আত-তাওবাহ : ১১৯ 

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, 
"তোমরা সততা অবলম্বন গ্রহণ কর, কেননা সত্যবাদিতা পুণ্যের পথ দেখায় আর পূণ্য জান্নাতের পথ দেখায়, একজন লোক সর্বদা সত্য বলতে থাকে এবং সত্যবাদিতার প্রতি অনুরাগী হয়, ফলে আল্লাহর নিকট সে সত্যবাদী হিসাবে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়।" মুসলিম

২. আমানতদারিতা
মুসলমানদের সে সব ইসলামী চরিত্র অবলম্বনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে তার একটি হচ্ছে আমানতসমূহ তার অধিকারীদের নিকট আদায় করে দেয়া। 
আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার হকদারদের নিকট আদায় করে দিতে।" সূরা আন নিসা : ৫৮
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সম্প্রদায়ের নিকট আল আমীন উপাধি লাভ করেছিলেন, তারা তাঁর নিকট তাদের সম্পদ আমানত রাখত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার অনুসারীদের মুশরিকরা কঠোর ভাবে নির্যাতন শুরু করার পর যখন আল্লাহ তাকে মক্কা হতে মদীনা হিজরত করার অনুমতি দিলেন তিনি আমানতের মালসমূহ তার অধিকারীদের নিকট ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা না করে হিজরত করেননি। অথচ যারা আমানত রেখেছিল তারা সকলেই ছিল কাফের। কিন্তু ইসলাম তো আমানত তার অধিকারীদের নিকট ফিরিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছে যদিও তার অধিকারীরা কাফের হয়।

৩. অঙ্গীকার পূর্ণ করা
ইসলামী মহান চরিত্রের অন্যতম হচ্ছে অঙ্গীকার পূর্ণ করা। 
আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا
"আর অঙ্গীকার পূর্ণ কর, কেননা অঙ্গীকার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবে।" সূরা ইসরা : ৩৪

আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকরা মুনাফিকের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে গণ্য করেছেন।

৪. বিনয়
ইসলামী চরিত্রের আরেকটি হচ্ছে একজন মুসলমান তার অপর মুসলিম ভাইদের সাথে বিনয়ী আচরণ করবে। সে ধনী হোক বা গরীব। 
আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِلْمُؤْمِنِينَ
"তুমি তোমার পার্শ্বদেশ মুমিনদের জন্য অবনত করে দাও।" সূরা আল হিজর : ৮৮

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, 
"আল্লাহ তাআলা আমার নিকট ওহী করেছেন যে, 'তোমরা বিনয়ী হও যাতে একজন অপরজনের উপর অহংকার না করে। একজন অপর জনের উপর সীমালংঘন না করে।" -মুসলিম।

৫. মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার
মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার উত্তম চরিত্রের অন্যতম। আর এটা তাদের অধিকার মহান হওয়ার কারণে, যে অধিকার স্থান হল আল্লাহর হকের পরে।ি 
আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا
'আর আল্লাহর ইবাদত কর, তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না, এবং মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার কর।" [সূরা আন-নিসা : ৩৫ আয়াত
আল্লাহ তাআলা তাদের আনুগত্য, তাদের প্রতি দয়া ও বিনয় এবং তাদের জন্য দু'আ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। 
আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
"তাদের উভয়ের জন্য দয়ার সাথে বিনয়ের ডানা নত করে দাও এবং বল, হে আমার রব! তাদের প্রতি দয়া কর যেভাবে শৈশবে আমাকে তারা লালন-পালন করেছেন।" [ সূরা আল ইসরা : ২৪ ]

এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করল, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমার উত্তম আচরণ পাওয়ার সবচেয়ে বেশী অধিকারী ব্যক্তি কে ? তিনি বললেন, 'তোমার মা।' অত:পর জিজ্ঞেস করল তারপর কে? তিনি উত্তর দিলেন, 'তোমার মা।' অতঃপর জিজ্ঞেস করল তার পর কে? তিনি উত্তর দিলেন, 'তোমার মা।' অতঃপর জিজ্ঞেস করল তার পর কে? উত্তর দিলেন, 'তোমার পিতা।' বুখারী ও মুসলিম

মাতা-পিতার প্রতি এ সদ্ব্যবহার ও দয়া অনুগ্রহ অতিরিক্ত বা পূর্ণতা দানকারী বিষয় নয় বরং তা হচ্ছে সকল মানুষের ঐক্যমতের ভিত্তিতে ফরযে আইন।

৬. আত্মীয়তার সর্ম্পক বজায় রাখা
আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ইসলামী চরিত্রের অন্যতম। আর তারা হচ্ছে নিকটাত্মীয়গণ যেমন, চাচা, মামা, ফুফা, খালা, ভাই, বোন প্রমূখ।
আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ওয়াজিব, আর তা ছিন্ন করা জান্নাত হতে বঞ্চিত ও অভিশাপের কারণ। 
আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ تَوَلَّيْتُمْ أَنْ تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ ﴿২২﴾ أُولَئِكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فَأَصَمَّهُمْ وَأَعْمَى أَبْصَارَهُمْ ﴿২৩﴾
" যদি তোমরা ক্ষমতা পাও, তাহলে কি তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে? তারা তো ঐ সব লোক যাদের প্রতি আল্লাহ অভিশাপ করেছেন। এতে তিনি তাদেরকে বধির করে দিয়েছেন এবং তাদের দৃষ্টি অন্ধ করে দিয়েছেন।" সূরা মুহাম্মাদ : ২২-২৩

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, 
"আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী বেহেশ্‌তে প্রবেশ করবে না।" বুখারী ও মুসলিম

৭. প্রতিবেশীর প্রতি সুন্দরতম ব্যবহার
প্রতিবেশীর প্রতি সুন্দরতম ব্যবহার হচ্ছে ইসলামী চরিত্রের অন্যতম। প্রতিবেশী হচ্ছে সে সব লোক যারা আপনার বাড়ীর আশে পাশে বসবাস করে। যে আপনার সবচেয়ে নিকটবর্তী সে সুন্দর ব্যবহার ও অনুগ্রহের সবচেয়ে বেশী হকদার।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ
"আর মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার কর, নিকটাত্মীয়, এতিম, মিসকীন নিকটতম প্রতিবেশী ও দূরবর্তী প্রতিবেশীর প্রতিও।" সূরা আন-নিসা : ৩৬
এতে আল্লাহ নিকটতম ও দূরবর্তী প্রতিবেশীর প্রতি সদ্ব্যবহার করতে ওসিয়ত করেছেন। 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেনঃ 
'জিবরীল আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে ওসিয়ত করতেছিল এমনকি আমি ধারণা করেনিলাম যে, প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকার বানিয়ে দেয়া হবে।' বুখারী ও মুসলিম
অর্থাৎ আমি মনে করেছিলাম যে ওয়ারিশদের সাথে প্রতিবেশীর জন্য মিরাসের একটি অংশ নির্ধারিত করে দেবে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু যর রা. কে লক্ষ্য করে বলেন, 'হে আবু যর! যখন তুমি তরকারী পাক কর তখন পানি বেশি করে দাও, আর তোমার প্রতিবেশীদের অঙ্গীকার পূরণ কর।" মুসলিম

প্রতিবেশীর পার্শ্বাবস্থানের হক রয়েছে যদিও সে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি অবিশ্বাসী বা কাফের হয়।

৮. মেহমানের আতিথেয়তা
ইসলামী চরিত্রের আরেকটি হচ্ছে মেহমানের আতিথেয়তা। 
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী, 
"যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং পরকালের প্রতি বিশ্বাস করে সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে।" বুখারী ও মুসলিম।

৯. সাধারণভাবে দান ও বদান্যতা
ইসলামী চরিত্রের অন্যতম দিক হচ্ছে দান ও বদান্যতা। আল্লাহ তাআলা ইনসাফ, বদান্যতা ও দান কারীদের প্রশংসা করেছেন। 
আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ثُمَّ لَا يُتْبِعُونَ مَا أَنْفَقُوا مَنًّا وَلَا أَذًى لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
"যারা আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে অতঃপর যা খরচ করেছে তা থেকে কারো প্রতি অনুগ্রহ ও কষ্ট দেয়ার উদ্দেশ্য করে না, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট প্রতিদান রয়েছে। তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুশ্চিন্তাও করবে না।" সূরা আল বাকারাহ : ২৬২

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, 
'যার নিকট অতিরিক্ত বাহন থাকে সে যেন যার বাহন নেই তাকে তা ব্যবহার করতে দেয়। যার নিকট অতিরিক্ত পাথেয় বা রসদ রয়েছে সে যেন যার রসদ নেই তাকে তা দিয়ে সাহায্য করে।" মুসলিম

১০. ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতা
ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতা হচ্ছে ইসলামী চরিত্রের অন্যতম বিষয়। অনুরূপভাবে মানুষদের ক্ষমা করা, দুর্ব্যবহারকারীকে ছেড়ে দেয়া ওজর পেশকারীর ওজর গ্রহণ করা বা মেনে নেয়াও অন্যতম। 
আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَلَمَنْ صَبَرَ وَغَفَرَ إِنَّ ذَلِكَ لَمِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ
"আর যে ধৈর্য্য ধারণ করল এবং ক্ষমা করল, নিশ্চয়ই এটা কাজের দৃঢ়তার অন্তর্ভূক্ত।" সূরা আশ শুরা : ৪৩

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 
'তারা যেন ক্ষমা করে দেয় এবং উদারতা দেখায়, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেয়া কি তোমরা পছন্দ কর না?' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, "দান খয়রাতে সম্পদ কমে যায় না। আল্লাহ পাক ক্ষমার দ্বারা বান্দার মার্যাদাই বৃদ্ধি করে দেন। যে আল্লাহর জন্য বিনয় প্রকাশ করে আল্লাহ তার সম্মানই বৃদ্ধি করে দেন।" [মুসলিম ] 

তিনি আরো বলেন, 
"দয়া কর, তোমাদের প্রতি দয়া করা হবে। ক্ষমা করে দাও তোমাদেরও ক্ষমা করে দেয়া হবে।" আহমাদ

১১. মানুষের মাঝে সমঝোতা ও সংশোধন:
ইসলামী চরিত্রের আরেকটি হচ্ছে মানুষের মাঝে সমঝোতা ও সংশোধন করে দেয়া, এটা একটি মহান চরিত্র যা ভালবাসা সৌহার্দ প্রসার ও মানুষের পারষ্পারিক সহযোগিতার প্রাণের দিকে নিয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন :
لَا خَيْرَ فِي كَثِيرٍ مِنْ نَجْوَاهُمْ إِلَّا مَنْ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ أَوْ مَعْرُوفٍ أَوْ إِصْلَاحٍ بَيْنَ النَّاسِ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ مَرْضَاةِ اللَّهِ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا
"তাদের অধিকাংশ শলাপরামর্শের মধ্যে কল্যাণ নেই। কেবল মাত্র সে ব্যক্তি ব্যতীত যে সাদকাহ, সৎকর্ম ও মানুষের মাঝে সংশোধনের ব্যাপারে নির্দেশ দেয়। যে আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে এসব করে অচিরেই আমরা তাকে মহা প্রতিদান প্রদান করব।" সূরা আন নিসা : ১১৪

১২. লজ্জা:
ইসলামী চরিত্রের অন্যতম আরেকটি চরিত্র হচ্ছে লজ্জা। এটা এমন একটি চরিত্র যা পরিপূর্ণতা ও মর্যাদাপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের দিকে আহবান করে। অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা হতে বারণ করে। লজ্জা আল্লাহর পক্ষ হতে হয়ে থাকে। ফলে মুসলমান লজ্জা করে যে, আল্লাহ তাকে পাপাচারে লিপ্ত দেখবে। অনুরূপভাবে মানুষের থেকে এবং নিজের থেকেও সে লজ্জা করে। লজ্জা অন্তরে ঈমান থাকার প্রমাণ বহন করে। 
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, 
'লজ্জা ঈমানের বিশেষ অংশ।' বুখারী ও মুসলিম।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, 
"লজ্জা কল্যাণ ছাড়া আর কিছুই নিয়ে আসে না।" বুখারী ও মুসলিম

১৩. দয়া ও করুণা:
ইসলামী চরিত্রের আরেকটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র হচ্ছে দয়া বা করুণা। এ চরিত্রটি অনেক মানুষের অন্তর হতে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। ফলে তাদের অন্তর পাথরের মত অথবা এর চেয়েও শক্ত হয়ে গেছে। আর প্রকৃত মু'মিন হচ্ছে দয়াময়, পরোপকারী, গভীর অনুভূতি সম্পন্ন উজ্জল অনুগ্রহের অধিকারী। 
আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
ثُمَّ كَانَ مِنَ الَّذِينَ آَمَنُوا وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ وَتَوَاصَوْا بِالْمَرْحَمَةِ ﴿১৭﴾ أُولَئِكَ أَصْحَابُ الْمَيْمَنَةِ ﴿১৮﴾
"অত:পর সে তাদের অন্তর্ভূক্ত হয় যারা ঈমান এনেছে পরস্পর পরস্পরকে ধৈর্য্য ও করুণার উপদেশ দিয়েছে। তারা হচ্ছে দক্ষিণ পন্থার অনুসারী।" সূরা আল-বালাদ : ১৭- ১৮

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, 
"মুমিনদের পারস্পরিক সৌহার্দ্য, করুণা, অনুকম্পার উপমা হচ্ছে একটি শরীরের মত। যখন তার একটি অঙ্গ অসুস্থ হয় গোটা শরীর নিদ্রাহীনতা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়।" মুসলিম

১৪. ইনসাফ বা ন্যায়পরায়ণতা:
ন্যায় পরায়ণতা ইসলামী চরিত্রের আরেকটি অংশ। এ চরিত্র আত্মার প্রশান্তি সৃষ্টি করে। সমাজে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন প্রকার অপরাধ বিমোচনের দিকে নিয়ে যায়। 
আল্লাহ তাআলা বলেন :
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى
"নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা ইহসান ও নিকটাত্মীয়দের দান করতে নির্দেশ দেন।" সূরা আল নাহাল : ৯০
আল্লাহ তাআলা বলেন :
اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى
"ইনসাফ কর, এটা তাক্বওয়ার অতীব নিকটবর্তী।" সূরা আল মায়িদা : ৮

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, 
"ন্যায়পরায় ব্যক্তিরা আল্লাহর নিকট নূরের মিম্বরের উপর বসবে। তারা হল সে সব লোক, যারা বিচার ফয়সালার ক্ষেত্রে, পরিবার-পরিজনের ক্ষেত্রে এবং যে দায়িত্বই পেয়েছে তাতে ইনসাফ করে।"

১৫. চারিত্রিক পবিত্রতা:
ইসলামী চরিত্রের অন্যতম বিষয় হচ্ছে চারিত্রিক পবিত্রতা। এ চরিত্র মানুষের সম্মান সংরক্ষণ এবং বংশে সংমিশ্রন না হওয়ার দিকে পৌঁছে দেয়। 
আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَلْيَسْتَعْفِفِ الَّذِينَ لَا يَجِدُونَ نِكَاحًا حَتَّى يُغْنِيَهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ
"যাদের বিবাহের সামর্থ নেই, তারা যেন চারিত্রিক পবিত্রতা গ্রহণ করে। যতক্ষণ না আল্লাহ তার অনুগ্রহে তাকে সম্পদশালী করেন।" [ সুরা আন নূর-৩৩ ]

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেছেন, 
"তোমরা আমার জন্য ছয়টি বিষয়ের জিম্মাদার হও। তাহলে আমি তোমাদের জন্য জান্নাতের জিম্মাদার হব। যখন তোমাদের কেউ কথা বলে সে যেন মিথ্যা না বলে। যখন তার কাছে আমানত রাখা হয় তখন যেন খেয়ানত না করে। যখন প্রতিশ্রুতি দেয় তা যেন ভঙ্গ না করে। তোমরা তোমাদের দৃষ্টি অবনত কর। তোমাদের হস্তদ্বয় সংযত কর। তোমাদের লজ্জাস্থান হেজাফত কর।" [ হাদীসটি তাবারানী বর্ণনা করেছেন এবং হাদীসটিকে 'হাসান' বলেছেন ]
ইসলামের এ সব চরিত্রে এমন কিছু নেই যা ঘৃণা করা যায়। বরং এসব এমন সম্মান যোগ্য মহৎ চারিত্রাবলী যা প্রত্যেক নিষ্কলুষ স্বভাবের অধিকারীর সমর্থন লাভ করে। মুসলমানগণ যদি এ মহৎ চরিত্র ধারণ করত তাহলে সর্বস্থান থেকে তাদের নিকট মানুষ আগমন করত এবং দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে তারা প্রবেশ করত যেভাবে প্রথম যুগের মুসলমানদের লেন-দেন ও চরিত্রের কারণে সে সময়ের মানুষ ইসলামে প্রবেশ করেছিল।