জাদুকর্ম, জ্যোতিষ ও দৈবকর্ম এবং এতদসংক্রান্ত অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে ইসলামের বিধান


সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহরই জন্য এবং দরুদ ও সালাম সেই মহান ব্যক্তির উপর বর্ষিত হোক যার পরে আর কোন নবী নেই।
সাম্প্রতিক কালে জাদু ও দৈবকর্মের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাধির চিকিৎসা করতে সক্ষম— এমন দাবিদার লোকদের সংখ্যা প্রচুর পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। সমাজের অশিক্ষিত শ্রেণির মূর্খতা আর নির্বুদ্ধিতাকে পুঁজি করে বিভিন্ন দেশে তারা তাদের এ পেশাকে সম্প্রসারিত করে চলেছে। আমি তাই আল্লাহ্‌র দেয়া নির্দেশ পালন এবং বান্দাদের সঠিক পথে চলার উপদেশ পালনের লক্ষ্যে এতদুভয়ের মধ্যে ইসলাম ও মুসলিম জনতার উপর যে গুরুতর বিপদ রয়েছে, সে সম্পর্কে আলোকপাত করতে চাই। কেননা এ উভয় কর্মে রয়েছে আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য সত্ত্বার সাথে (নির্ভরতামূলক) সম্পর্কস্থাপন এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নির্দেশ লঙ্ঘন।

তাই আমি আল্লাহর সাহায্য কামনা করে বলছি— সকল মুসলিম মনীষীদের সর্বসম্মত মতানুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ বৈধ। আর যে কোন মুসলিম ব্যক্তিরই অধিকার রয়েছে যে, সে আভ্যন্তরীণ রোগের ডাক্তার কিংবা শৈল চিকিৎসক অথবা মানসিক রোগের ডাক্তার কিংবা অনুরূপ যে কারও কাছে যেতে পারে, যাতে তিনি তার রোগ-ব্যাধি চিহ্নিত করে চিকিৎসা শাস্ত্রে তার জ্ঞান অনুযায়ী শরী‘আত কর্তৃক অনুমোদিত পথ্য দ্বারা তার চিকিৎসা করেন। কেননা এটা সাধারণ বৈধ পন্থাসমূহ অবলম্বনেরই অন্তর্গত। উপরন্তু এ ধরনের পন্থাবলম্বন আল্লাহর উপর নির্ভরতার পরিপন্থী নয়। কারণ আল্লাহ তা‘আলা রোগ দিয়েছেন এবং সে রোগ নিরাময়ের ঔষধও বাতলে দিয়েছেন। যার জানার সে তা জেনেছে এবং যে জানে নি, এ পথ্য তার অজ্ঞাতই থেকে গেছে। অবশ্য আল্লাহ্‌ তা‘আলা বান্দার উপর হারাম করেছেন এমন কোন বস্তুকে তার রোগ নিরাময়ের উপায় নির্ধারণ করেননি।

সুতরাং অসুস্থ ব্যক্তির জন্য সেই সব গণক, জ্যোতিষী ও দৈবজ্ঞদের কাছে যাওয়া বৈধ নয়, যারা দাবি করে যে, তাদের কাছে অসুস্থ ব্যক্তির রোগ চিহ্নিত করার গায়েবী জ্ঞান রয়েছে। তদ্রূপ অসুস্থ ব্যক্তির জন্যও এসব গণক ও দৈবজ্ঞদের দেয়া তথ্য ও সংবাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা বৈধ নয়। কেননা তারা গায়েবী বিষয়ে অনুমানের উপর ভিত্তি করেই এসব বলে থাকে কিংবা তারা তাদের ঈপ্সিত বিষয়ে সাহায্য নেয়ার জন্য জিনদের হাযির করে থাকে। এদের ব্যাপারে শর‘য়ী হুকুম হল— এরা কুফুরী ও ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত যদি তারা গায়েবী জ্ঞান আছে বলে দাবি করে।

ইমাম মুসলিম তাঁর সহিহ গ্রন্থে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
من أتى عرافا فسأله عن شيء لم تقبل له صلاة أربعين ليلة
অর্থ : ‘‘যে ব্যক্তি কোন দৈবজ্ঞের কাছে এসে কোন বিষয়ে জিজ্ঞেস করে, চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার নামায কবুল হবে না’’।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
"من أتى كاهنا فصدقه بما يقول فقد كفر بما أنزل علي محمد صلى الله عليه وسلم"
অর্থ : ‘‘যে ব্যক্তি কোন গণকের কাছে আসে এবং সে যা বলে তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, সে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর অবতীর্ণ সত্যের প্রতি কুফুরী করল।’’ 
এ হাদিসটি আবু দাউদ ও সুনানের চারটি গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। আর হাকেম হাদিসটিকে সহিহ বলে অন্য শব্দে বর্ণনা করেছেন।
"من أتى عرافا أو كاهنا فصدقه فيما يقول فقد كفر بما أنزل على محمد صلى الله عليه و سلم"
অর্থ : ‘‘যে ব্যক্তি কোন দৈবজ্ঞ বা গণকের কাছে আসে এবং তার বক্তব্যকে সত্য বলে মেনে নেয়, সে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর অবতীর্ণ সত্যকে অস্বীকার করল।’’ 
ইমরান ইবনে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
"ليس منا من تطير أو تطير له، أو تكهن أو تكهن له، أو سحر أو سحر له ومن أتى كاهنا فصدقه بما يقول فقد كفر بما أنزل على محمد"
অর্থ : ‘‘যে ব্যক্তি নির্দিষ্ট কিছুর ভিত্তিতে কোন কিছু অশুভ বলে ঘোষণা দেয় কিংবা যার জন্য [তার চাওয়া অনুসারে] অশুভ বলে ঘোষণা দেয়া হয়; যে ব্যক্তি গণনা করে কিংবা যার জন্য [তার চাওয়া অনুসারে] গণনা করা হয়; যে ব্যক্তি জাদু করে কিংবা যার জন্য [তার চাওয়া অনুসারে] জাদু করা হয়— তাদের কেউই আমাদের অন্তর্গত নয়। আর যে ব্যক্তি কোন গণকের কাছে এসে তার বক্তব্যকে সত্য মনে করে, সে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর অবতীর্ণ সত্যকে অস্বীকার করল’’। হাদিসটি বায্‌যার উত্তম সনদে বর্ণনা করেছেন।

উপরে বর্ণিত হাদিসসমূহে দৈব জ্ঞানের দাবিদার, গণক, জাদুকর ও তদনুরূপ লোকদের কাছে আসতে এবং তাদেরকে কোন কিছু জিজ্ঞেস করতে ও তাদের বক্তব্য সত্য বলে বিশ্বাস করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং এ ব্যাপারে ভয় প্রদর্শন ও করা হয়েছে। সুতরাং শাসকবর্গ ও মানুষকে সৎ কাজের আদেশদানের এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ— যাদের হাতে ক্ষমতা ও শক্তি রয়েছে, তাদের প্রত্যেকেরই উচিত গণক, দৈব জ্ঞানের দাবিদার ও অনুরূপ পেশাজীবীদের কাছে আসতে লোকদের নিষেধ করা, হাটে-বাজারে ও অন্যত্র যে কোন ধরনের দৈবজ্ঞান আদান প্রদান নিষিদ্ধ করা, দৈবজ্ঞ ও তাদের কাছে যারা আসে সবার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা।

তাদের কথা কোন কোন ব্যাপারে সত্য বলে প্রমাণিত হওয়ার ফলে এবং এক শ্রেণির লোক তাদের কাছে বেশি আনাগোনা করার ফলে তাদের দ্বারা কারো প্রতারিত হওয়া ঠিক নয়। কারণ ঐ শ্রেণির লোকেরা মূলত মূর্খ। তাই তাদের দ্বারা প্রতারিত হওয়া অনুচিত। কেননা এতে গুরুতর পাপ, মহাবিপদ ও খারাপ পরিণতি থাকায় এবং যারা এসব কাজে লিপ্ত তারা মিথ্যাবাদী ও দুষ্ট প্রকৃতির লোক হওয়ায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে আসতে, প্রশ্ন করতে এবং তাদেরকে সত্যবাদী হিসাবে প্রতিপন্ন করতে নিষেধ করেছেন। 

অনুরূপভাবে আলোচ্য হাদিসসমূহে এও প্রমাণিত হয় যে, গণক ও জাদুকররা কাফির। কেননা তারা অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী হওয়ার দাবি করছে, যা কিনা কুফুরী। তদুপরি তারা আল্লাহ্‌কে ছেড়ে জিনের সেবা ও ইবাদাত-এর মাধ্যমেই তাদের উদ্দেশ্য সাধন করছে। অথচ এ কাজও কুফুরী এবং আল্লাহর সাথে শরীক করারই নামান্তর। যে ব্যক্তি তাদের অদৃশ্য জ্ঞানের দাবিকে সত্য প্রতিপন্ন করে সে ও তাদেরই অনুরূপ। আর যে সব ব্যক্তি এ বিষয়গুলো এমন লোকদের কাছ থেকে গ্রহণ করে, যারা তা পরস্পর আদান-প্রদান করে থাকে, সে সব ব্যক্তির সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোন সম্পর্ক নেই। এসব লোক যাকে চিকিৎসা বলে ধারণা করে থাকে, তাকে মেনে নেয়া ও গ্রহণ করা কোন মুসলিমের জন্য জায়েয নেই। যেমন বিড়-বিড় করে মন্ত্রোচ্চারণ কিংবা পানিতে ইস্পাত চুবানো ইত্যাদি আরও অনেক কুসংস্কার যা তারা করে থাকে-কোনটাই জায়েয নয়। কেননা তা দৈবকর্ম চর্চা ও মানুষকে বিভ্রান্ত করারই নামান্তর। এসব ব্যাপারগুলোকে যারা মেনে নেয়, তারা মূলত এ লোকদেরকে তাদের বাতিল ও কুফুরী কাজে সহযোগিতা করলো। অনুরূপভাবে কোন মুসলিম ব্যক্তির জন্য জ্যোতিষী ও দৈব জ্ঞানের দাবিদারদের কাছে গিয়ে একথা জিজ্ঞেস করা জায়েয নেই যে, তার ছেলে কিংবা তার কোন আত্মীয় কাকে বিয়ে করবে? কিংবা স্বামী-স্ত্রী ও তাদের উভয়ের পরিবারে ভালবাসা ও মিল-মহব্বত হবে নাকি শত্রুতা ও দূরত্বের সৃষ্টি হবে ইত্যাদি। কেননা এসব সে গায়েবী ও অদৃশ্য জ্ঞানেরই অন্তর্গত যা শুধু মহান আল্লাহ্‌ তা‘আলা ছাড়া আর কেউ জানে না।


জাদু বিদ্যা হারাম ও কুফুরী 

যেমন আল্লাহ্‌ তা‘আলা সূরা আল-বাকারায় হারুত-মারুত নামক দুই ফেরেশতার ব্যাপারে বলেছেন :
﴿وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلا تَكْفُرْ فَيَتَعَلَّمُونَ مِنْهُمَا مَا يُفَرِّقُونَ بِهِ بَيْنَ الْمَرْءِ وَزَوْجِهِ وَمَا هُمْ بِضَارِّينَ بِهِ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ وَيَتَعَلَّمُونَ مَا يَضُرُّهُمْ وَلا يَنْفَعُهُمْ وَلَقَدْ عَلِمُوا لَمَنِ اشْتَرَاهُ مَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ خَلاقٍ وَلَبِئْسَ مَا شَرَوْا بِهِ أَنْفُسَهُمْ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ﴾
অর্থ : ‘‘তারা উভয়ই একথা না বলে কাউকে শিক্ষা দিত না যে, আমরা নিছক একটি পরীক্ষা মাত্র; কাজেই তুমি কুফুরী করো না। তা সত্ত্বেও তারা ফেরেশতাদ্বয়ের কাছ থেকে এমন জাদু শিখত, যদ্বারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো যায়। অথচ তারা আল্লাহ্‌র আদেশ ছাড়া তদ্বারা কারো অনিষ্ট করতে পারত না। এতদ্‌সত্ত্বেও তারা তা-ই শিখত যা তাদের ক্ষতি করত এবং কোন উপকারে আসতো না। তারা ভালভাবে জানে যে, যে কেউ তা খরিদ করে (অর্থাৎ জাদুর আশ্রয় নেয়) তার জন্য আখেরাতে কোন অংশ নেই। যার বিনিময়ে তারা নিজেদের বিকিয়ে দিচ্ছে তা খুবই মন্দ যদি তারা জানত! [সূরা আল-বাকারাহ্: ১০২]
এ আয়াত দ্বারা বুঝা যায় যে, জাদু বিদ্যা কুফুরী এবং জাদুকররা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে। আয়াতটি দ্বারা আরও প্রমাণিত যে, যে জাদু ভাল-মন্দের আসল কার্যকারণ নয়, বরং আল্লাহ্‌র পূর্বনির্ধারিত জাগতিক নিয়ম ও নির্দেশেই মূলত তা প্রভাব বিস্তার করে থাকে। কেননা আল্লাহ্‌ তা‘আলাই ভাল ও মন্দ সৃষ্টি করেন। এসমস্ত মিথ্যা অপবাদ আরোপকারী ব্যক্তিগণ যারা মুশরিকদের থেকে এ ধরনের জ্ঞান অর্জন করেছে এবং এর মাধ্যমে দুর্বল-চিত্তের লোকদের উপর বিভ্রান্তির প্রহেলিকা সৃষ্টি করেছে— তাদের দ্বারা সাধিত ক্ষতি ইতিমধ্যেই বিশাল আকার ধারণ করেছে। অথচ স্মরণ রাখা দরকার আমরা তো আল্লাহ্‌রই জন্য এবং আল্লাহ্‌র দিকেই আমাদের ফিরে যেতে হবে। তিনিই তো আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং উত্তম তত্ত্বাবধায়ক।
অনুরূপভাবে আয়াতে কারীমাতে এদিকেও ইঙ্গিত রয়েছে যে, যারা জাদু শিখে তারা মূলত এমন বিদ্যাই শিখে যা তাদের ক্ষতি করে এবং কোন উপকারে আসে না, আর আল্লাহ্‌র কাছে তাদের কিছুই পাওয়ার নেই। এটা অত্যন্ত বড় সতর্কবাণী, যা দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবার ইঙ্গিতই বহন করছে আর এও বুঝা যাচ্ছে যে, তারা অত্যন্ত নগণ্য মূল্যে নিজেদেরকে বিকিয়ে দিয়েছে তাই আল্লাহ্‌ তা‘আলা এ-ব্যাপারে তাদের নিন্দা করেছেন। তিনি এরশাদ করেছেন :
﴿وَلَبِئْسَ مَا شَرَوْا بِهِ أَنْفُسَهُمْ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ﴾
অর্থ : ‘‘যার বিনিময়ে তারা নিজেদের বিকিয়ে দিচ্ছে তা খুবই মন্দ যদি তারা জানত!” [সূরা আল-বাকারাহ্ : ১০২]

জাদুকর, গণক এবং সকল প্রকার ভোজবাজীকর ও ভেল্কিবাজদের অমঙ্গল থেকে আমরা আল্লাহ্‌র কাছে নিরাপত্তা কামনা করি। আমরা তাঁর কাছে এও কামনা করি যে, তিনি যেন এসব লোকের ক্ষতি থেকে মুসলিমদেরকে রক্ষা করেন এবং এসব লোক সম্পর্কে সতর্ক করা ও তাদের ব্যাপারে আল্লাহ্‌র হুকুম কার্যকর করার জন্য মুসলিম শাসকদের তাওফিক দান করেন। যাতে তাদের ক্ষতি ও নিকৃষ্ট কাজ হতে আল্লাহ্‌র বান্দাগণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে। নিশ্চয়ই তিনি দানশীল মহান। 

আল্লাহ্‌ তাঁর বান্দাদের প্রতি স্বীয় রহমাত ও অনুগ্রহস্বরূপ এবং তাঁর নিয়ামতের পূর্ণতা সাধনকল্পে তাদের জন্য এমন সব ব্যবস্থা নির্ধারণ করে দিয়েছেন যদ্বারা জাদুকর্ম সংঘটিত হওয়ার পূর্বে এর অমঙ্গল থেকে তারা রক্ষা পেতে পারে এবং এমন পদ্ধতি ও তাদের জন্য বর্ণনা করে দিয়েছেন যাতে জাদুকর্ম সংঘটিত হওয়ার পর তারা এর চিকিৎসা করতে পারে। 

• যা দ্বারা জাদু সংঘটিত হওয়ার পূর্বে এর বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায় এবং শরী‘আতে বৈধ এমন যে সব বস্তু দ্বারা জাদু সংঘটিত হওয়ার পর এর চিকিৎসা করা যায়-সে সব কিছু নিচে বর্ণনা করা হলো।
যে সব বস্তু দ্বারা জাদু সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই জাদুর ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া যায় তন্মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও উপকারী হল শরী‘আত সম্মত যিক্‌র-আযকার এবং হাদিসে বর্ণিত যাবতীয় দো‘আসমূহ। আর এসবের মধ্যে রয়েছে প্রত্যেক ফরয নামাযের সালাম ফিরিয়ে শরী‘আত অনুমোদিত যিক্‌র-আযকার পাঠের পর এবং নিদ্রা যাওয়ার সময় আয়াতুল কুরসী পড়া। আয়াতুল কুরসী কুরআন কারীমের সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন আয়াত। আয়াতটি নীচে দেয়া হলো:
﴿اللَّهُ لا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلا نَوْمٌ لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَلا يَؤُودُهُ حِفْظُهُمَا وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ﴾
অর্থ : ‘‘আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কোন হক মাবুদ নেই, তিনি জীবিত, সবার তত্ত্বাবধায়ক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও জমিনে যা কিছু রয়েছে সবই তাঁর। কে আছে এমন যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া ? তাদের সামনে ও পেছনে যা কিছু রয়েছে সবই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞাত বিষয় হতে কোন কিছুকেই তারা আয়ত্তাধীন করতে পারে না। কিন্তু কোন বিষয় যদি তিনি নিজেই জানাতে চান, তবে অন্য কথা। তাঁর কুরসী সমস্ত আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ তাঁর জন্য কষ্ট সাধ্য নয়। তিনি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন এবং মহান।” [সূরা আল-বাকারা : ২৫৫]

এসব যিক্‌র ও দো‘আর মধ্যে আরও রয়েছে প্রত্যেক ফরয নামাযের পর قل هو الله أحد ও قل أعوذ برب الفلق এবং قل أعوذ برب الناس পড়া। এই সূরাগুলো ফজরের পর দিবসের প্রথম ভাগে ও মাগরিবের পর রাত্রির শুরুতে এবং ঘুমের সময় তিনবার করে পড়া। এছাড়া রাত্রির প্রথমভাগে সূরা আল-বাকারার নিম্নলিখিত শেষ দুই আয়াত পড়া। আয়াতদ্বয় হলো :
﴿آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مِنْ رَبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ كُلٌّ آمَنَ بِاللَّهِ وَمَلائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْ رُسُلِهِ وَقَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ * لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْساً إِلَّا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ رَبَّنَا لا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا رَبَّنَا وَلا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْراً كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِنَا رَبَّنَا وَلا تُحَمِّلْنَا مَا لا طَاقَةَ لَنَا بِهِ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنْتَ مَوْلانَا فَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ﴾
অর্থ: ‘‘রাসূল ঈমান এনেছেন সে সব বিষয়ের প্রতি যা তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মু’মিনগণও। সকলেই ঈমান এনেছে আল্লাহ্‌র প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি। তারা বলে, আমরা তাঁর রাসূলগণের মধ্যে তারতম্য করি না। আর এও বলে : আমরা শুনেছি এবং মেনে নিয়েছি। হে আমাদের রব! তোমার ক্ষমা চাই এবং তোমার দিকেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে। আল্লাহ্‌ কাউকে তাঁর সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না। যে পুণ্য সে অর্জন করে এর প্রতিফল তার জন্য এবং সে যে মন্দ কাজ করে সে কাজের প্রতিফল ও তার উপরই বর্তাবে। হে আমাদের পালনকর্তা ! আমরা যদি ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে আমাদেরকে পাকড়াও করো না। হে আমাদের রব! আর আমাদের উপর এমন ভারী বোঝা অর্পণ করো না, যেমন আমাদের পূর্ববর্তীদের উপর অর্পণ করেছো। হে আমাদের প্রভু! আর আমাদের উপর এমন কাজের ভার চাপিয়ে দিও না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই। আমাদের পাপ মোচন কর। আমাদেরকে ক্ষমা কর এবং আমাদের প্রতি দয়া কর। তুমিই আমাদের প্রভু। সুতরাং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য কর। [আল-বাকারাহ্ : ২৮৫-২৮৬]

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহিহ-সূত্রে বর্ণিত :
من قرأ آية الكرسي في ليلة لم يزل عليه من الله حافظ ولا يقربه شيطان حتى يصبح
অর্থ : ‘‘যে ব্যক্তি রাতে আয়াতুল কুরসী পাঠ করে, ভোর হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে তার উপর একজন হেফাযতকারী নিয়োজিত থাকে এবং শয়তান তার নিকটবর্তী হয় না।’’
সহিহ সূত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এও বর্ণিত যে, তিনি বলেন:
من قرأ الآيتين من آخر سورة البقرة في ليلة كفتاه
অর্থ : ‘‘যে ব্যক্তি রাতে সূরা আল-বাকারার শেষের দু’টি আয়াত পাঠ করবে, ওটাই তার জন্য যথেষ্ট।’’
হাদিসটির মর্মার্থ হলো : ‘‘সকল অনিষ্ট হতে তার রক্ষা পাওয়ার জন্য যথেষ্ট’’।

• জাদুর ক্ষতি হতে রক্ষা পাওয়ার দো‘আর মধ্যে আরও রয়েছে: 
রাতদিন এবং কোন বসতবাড়ি কিংবা মরুভূমিতে অথবা জলে কিংবা অন্তরীক্ষে অবস্থানের সময় নীচের দো‘আটি বেশি বেশি পাঠ করবে:
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ
অর্থ : ‘‘আল্লাহ্‌র পরিপূর্ণ বাণী দ্বারা তাঁর নিকট আমি সৃষ্টির যাবতীয় অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাচ্ছি’’।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : 
من نزل منزلا فقال : أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ لم يضره شيء حتى يرتحل من منزله ذلك
অর্থ : ‘‘যে ব্যক্তি কোন স্থানে অবতরণ করার পর বলে: ‘আল্লাহ্‌র পরিপূর্ণ বাণী দ্বারা তাঁর নিকট আমি সৃষ্টির যাবতীয় অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাচ্ছি’— সে ঐ স্থান থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত কোন কিছুই তার ক্ষতি কারতে পারবে না’’।
এসব দো‘আর মধ্যে আরও রয়েছে দিবসের প্রথম ভাগে ও রজনীর শুরুতে নীচের দো‘আটি তিনবার পাঠ করা : 
بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
অর্থ : ‘‘আমি সেই আল্লাহ্‌র নামে আরম্ভ করছি, যার নামে শুরু করলে আকাশ ও পৃথিবীর কোন বস্তুই কোনরূপ অনিষ্ট সাধন করতে পারেনা। বস্তুত তিনি হচ্ছেন সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা’’।
কেননা সহিহ সূত্রানুযায়ী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এ ব্যাপারে উৎসাহ দেয়া হয়েছে এবং এটাই প্রত্যেক মন্দ হতে নিরাপদ থাকার কারণ। 
এ সকল যিক্‌র ও দো‘আ জাদু ও অনুরূপ অপকর্মের অমঙ্গল থেকে পরিত্রাণ পাবার সর্বোত্তম পন্থা তাদের জন্য যারা সততা, ঈমান, আল্লাহ্‌র প্রতি আস্থা ও নির্ভরতা সহকারে এবং এসব দো‘আর অর্থের প্রতি আন্তরিকতা রেখে এগুলো চর্চা করে। এ একই দো‘আ সমূহ জাদু সংঘটিত হবার পরও জাদুর ক্রিয়া দূর করার সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। অবশ্য পাশাপাশি আল্লাহ্‌র কাছে বেশি বেশি বিনয় প্রকাশ এবং বিপদ ও ক্ষতি দূর করার জন্য প্রার্থনা করতে হবে।

আর জাদু ও অন্যান্য রোগের চিকিৎসায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত বিশুদ্ধ দো‘আর মধ্যে আরও রয়েছে নীচের দো‘আটি তিনবার পাঠ করা। এটি দ্বারা তিনি তাঁর সাহাবিদেরকে ঝাড়ফুঁক করতেন। দো‘আটি হল:
اللّٰهُمَّ رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبِ البَأسَ وَاشْفِ أَنْتَ الشَّافِي، لاَ شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ، شِفَاءً لاَ يُغَادِرُ سَقَمًا
অর্থ: ‘‘হে আল্লাহ্‌! যিনি মানুষের পালন কর্তা ! বিপদ দূর করে দাও এবং আরোগ্য দান কর। তুমিই আরোগ্য-দাতা। তোমার আরোগ্য দান ছাড়া কোন আরোগ্য লাভই সম্ভব নয়। এমন আরোগ্য দাও যার পরে আর কোন রোগ-ব্যাধি থাকবে না’’।
এছাড়া জিবরাইল আলাইহিস্ সালাম যে দো‘আ পাঠ করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঝেড়েছিলেন, তা হল:
بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ، وَمِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنٍ حَاسِدٍ اللَّهُ يَشْفِيكَ، بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ
অর্থ : ‘‘আল্লাহ্‌র নামে আমি আপনাকে ঝাড়ছি, এমন সকল বস্তু হতে যা আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে। আর প্রত্যেক প্রাণীর অমঙ্গল হতে ও ঈর্ষাকারীর বদ নজর হতে আল্লাহ্‌ আপনাকে শিফা দান করুন। আল্লাহ্‌র নামে আমি আপনাকে ঝাড়ছি’’।
এ দো‘আটিও তিনবার পাঠ করতে হবে।

জাদু-ক্রিয়া সংঘটিত হবার পর জাদুর কারণে স্ত্রী সহবাস হতে বাধাগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য খুবই উপকারী চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে সাতটি সবুজ বরই পাতা নিয়ে পাথর বা অনুরূপ কিছু দিয়ে তা ঘষে কোন পাত্রে রাখা এবং গোসলের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ পানি এতে ঢেলে তাতে আয়াতুল কুরসী, সূরা আল-কাফিরূন, সূরা কুল হুয়াল্লাহু আহাদ, সূরা কুল আ‘উযু বিরাব্বিল ফালাক্ব এবং সূরা ক্বুল আ‘উযু বিরাব্বিন নাস পড়বে। এর সাথে সূরা আল-আ‘রাফের জাদুর আয়াতগুলোও পাঠ করবে। সে আয়াতগুলো হল:
﴿وَأَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى أَنْ أَلْقِ عَصَاكَ فَإِذَا هِيَ تَلْقَفُ مَا يَأْفِكُونَ (117) فَوَقَعَ الْحَقُّ وَبَطَلَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ (118) فَغُلِبُوا هُنَالِكَ وَانْقَلَبُوا صَاغِرِينَ (119)﴾
অর্থ : ‘‘আর আমি মূসার প্রতি ওহী পাঠালাম, ‘‘এবার নিক্ষেপ কর তোমার লাঠিখানা’’। সঙ্গে সঙ্গে তা সে সমুদয়কে গিলতে লাগল যা তারা বনিয়েছিল জাদু বলে। ফলে সত্য প্রমাণিত হলো এবং বাতিল হয়ে গেল তারা যা কিছু করছিল। সুতরাং তারা সেখানে পরাভূত হলো ও লাঞ্ছিত হয়ে ফিরল’’। [সূরা আল-আ’রাফ : ১১৭-১১৯]
অনুরূপভাবে সূরা ইউনুসের নিম্নলিখিত আয়াতগুলোও পড়বে :
﴿وَقَالَ فِرْعَوْنُ ائْتُونِي بِكُلِّ سَاحِرٍ عَلِيمٍ (79) فَلَمَّا جَاءَ السَّحَرَةُ قَالَ لَهُمْ مُوسَى أَلْقُوا مَا أَنْتُمْ مُلْقُونَ (80) فَلَمَّا أَلْقَوْا قَالَ مُوسَى مَا جِئْتُمْ بِهِ السِّحْرُ إِنَّ اللَّهَ سَيُبْطِلُهُ إِنَّ اللَّهَ لَا يُصْلِحُ عَمَلَ الْمُفْسِدِينَ (81) وَيُحِقُّ اللَّهُ الْحَقَّ بِكَلِمَاتِهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُجْرِمُونَ (82)﴾
অর্থ : ‘‘আর ফের‘আউন বলল, আমার কাছে নিয়ে এস সুদক্ষ জাদুকরদেরকে। তারপর যখন জাদুকররা এলো, মূসা তাদেরকে বলল: তোমাদের যা কিছু নিক্ষেপ করার তা নিক্ষেপ কর। অতঃপর যখন তারা নিক্ষেপ করল, মূসা বলল: যা কিছু তোমরা এনেছ তা সবই জাদু— নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ এসব ভণ্ডুল করে দিবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্‌ ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের কাজকে সংশোধন করেন না। আল্লাহ্‌ সত্যকে সত্যে পরিণত করেন, যদিও পাপীদের তা মনঃপুত নয়’’। [সূরা ইউনুস: ৭৯-৮২]
পরিশেষে সূরা ত্বাহার নিম্নের আয়াতগুলো পড়বে:
﴿قَالُوا يَا مُوسَى إِمَّا أَنْ تُلْقِيَ وَإِمَّا أَنْ نَكُونَ أَوَّلَ مَنْ أَلْقَى (65) قَالَ بَلْ أَلْقُوا فَإِذَا حِبَالُهُمْ وَعِصِيُّهُمْ يُخَيَّلُ إِلَيْهِ مِنْ سِحْرِهِمْ أَنَّهَا تَسْعَى (66) فَأَوْجَسَ فِي نَفْسِهِ خِيفَةً مُوسَى (67) قُلْنَا لا تَخَفْ إِنَّكَ أَنْتَ الْأَعْلَى (68) وَأَلْقِ مَا فِي يَمِينِكَ تَلْقَفْ مَا صَنَعُوا إِنَّمَا صَنَعُوا كَيْدُ سَاحِرٍ وَلا يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ أَتَى﴾
অর্থ: ‘‘তারা বলল, হে মূসা! হয় তুমি নিক্ষেপ কর, না হয় আমরাই প্রথমে নিক্ষেপ করি। মূসা বলল: বরং তোমরাই নিক্ষেপ কর। তাদের জাদুর প্রভাবে হঠাৎ তাঁর মনে হল, যেন তাদের রশিগুলো ও লাঠিগুলো ছুটাছুটি করছে। এতে মূসা মনে মনে কিছুটা ভীতি অনুভব করলেন। আমি বললাম, ভয় পেয়ো না, তুমি বিজয়ী হবে। তোমার ডান হাতে যা আছে তা তুমি নিক্ষেপ কর। তারা যা কিছু করেছে এটা তা গ্রাস করে ফেলবে। তারা যা করেছে তাতো কেবল জাদুকরের কলাকৌশল। জাদুকর যেখানেই আসুক সফল হবে না’’। [সূরা ত্বাহা : ৬৫-৬৯]
উপরোক্ত আয়াতসমূহ পানিতে পাঠ করার পর তা হতে তিন কোষ পরিমাণ পান করবে এবং অবশিষ্টাংশ দিয়ে গোসল করবে। আল্লাহ চাহে-তো এর দ্বারা রোগ দূর হবে। প্রয়োজনে রোগের উপসম হওয়া পর্যন্ত দুই বা ততোধিকবার এ চিকিৎসা গ্রহণ করা যাবে। 

জাদুর সর্বোত্তম চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে ভূমি, পাহাড় কিংবা অন্য কোথাও জাদুর স্থান সম্পর্কে অবগত হওয়ার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করা। তা জানতে পারলে এবং বের করে নষ্ট করে ফেললে জাদু নিষ্ফল হয়ে যাবে।
জাদু হতে রক্ষা পাওয়ার এবং এর চিকিৎসার এই বিষয়গুলো এখানে বর্ণনা করা হলো। আল্লাহ্‌ তাওফিক ও সামর্থ্য দেয়ার মালিক।
তবে খেয়াল রাখতে হবে যে, জাদু-ক্রিয়ার মাধ্যমে জাদুর চিকিৎসা যা কিনা যবেহ কিংবা তদনুরূপ কোন ইবাদাতের মাধ্যমে জিনের নৈকট্য হাসিলেরই নামান্তর— তা কোনক্রমেই জায়েয নয়। কেননা তা হচ্ছে মূলত শয়তানের কাজ। বরং তা শিরকে আকবার তথা বড় শিরকের অন্তর্গত। অতএব এমন কাজ থেকে বিরত থাকা অপরিহার্য। 
অনুরূপভাবে গণক, দৈব জ্ঞানের দাবিদার ও বাজীকরদেরকে প্রশ্ন করে তাদের বাতিয়ে দেয়া পদ্ধতি ব্যবহার করার মাধ্যমে জাদুর চিকিৎসা গ্রহণও জায়েজ নাই। কেননা তারা গায়েবী জ্ঞানের দাবি করে এবং মানুষের কাছে তা হেঁয়ালিপূর্ণ করে তুলে ধরে। শুরুতেই বলা হয়েছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে আসতে, তাদের কাছে কোন কিছু চাইতে ও তাদেরকে সত্য বলে মানতে নিষেধ করেছেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহিহ সূত্রে বর্ণিত— 
তাঁকে ‘‘নাশরা’’ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, এটা শয়তানের কাজ। ইমাম আহমদ ও আবু দাউদ উত্তম সনদে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।
‘নাশরা’ হচ্ছে জাদুকৃত ব্যক্তি থেকে জাদুর ক্রিয়া দূর করা। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর একথার অর্থ হল জাহেলি যুগের সে ‘নাশরা’ যা লোকজনের মধ্যে প্রচলিত ছিল। আর তা হল— জাদুকরকে জাদু দূর করার জন্য অনুরোধ করা কিংবা অন্য জাদুকরের কাছে গিয়ে অনুরূপ জাদু দিয়ে জাদুর ক্রিয়া নষ্ট করা।

আর শর‘য়ী যিক্‌র ও দো‘আ এবং মুবাহ ঔষধ-পত্র দ্বারা জাদু দূর করায় কোন অসুবিধা নেই। সে আলোচনা ইতিপূর্বেই করা হয়েছে। আল্লামা ইবনুল কাইয়েম রাহেমাহুল্লাহ ও ‘ফাতহুল মাজীদ’ গ্রন্থে শেখ আবদুর রহমান ইবন হাসান রাহেমাহুল্লাহ এবং আরও অনেক আলেম এ ধরনের কথাই বলেছেন।
পরিশেষে আল্লাহ্‌র কছে প্রার্থনা জানাই মুসলিমদেরকে যেন প্রত্যেক মন্দ ও খারাপি থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দেন এবং তাদের দ্বীনকে হেফাজত করেন, তাদেরকে দ্বীনের জ্ঞান দান করেন এবং শরী‘আত বিরোধী প্রত্যেক বস্তু থেকে বাঁচিয়ে রাখেন।
ওয়া সাল্লাল্লাহু ওয়াসাল্লামা ‘আলা ‘আবদিহী ওয়া রাসূলিহী মুহাম্মাদ, ওয়া ‘আলা আলিহী ওয়াসাল্লাম॥

যাদু, ভাগ্য গণনা ও দৈব কর্ম



যাদু, ভাগ্য গণনা ও দৈব কর্ম


এসব কিছুই শয়তানী কাজ-কর্ম এবং হারাম, যা আক্বীদায় ত্রুটি সৃষ্টি করে কিংবা আক্বীদা নষ্ট করে দেয়। কেননা শিরকী কাজ-কর্ম ছাড়া এগুলো অর্জন করা যায় না।

১. যাদু:

যাদু এমন এক বস্তুকে বলা হয় যার উপকরণ নিতান্ত গোপন ও সূক্ষ্ণ হয়ে থাকে। আর যাদুকে যাদু নামে এজন্য অভিহিত করা হয় যে, এটা এমন সব গোপনীয় কাজের মাধ্যমে অর্জিত হয় যা দৃষ্টির আগোচরে থাকে। যাদুর মধ্যে মন্ত্র পাঠ, ঝাড়ফুঁক, বাণী উচ্চারণ, ঔষধপত্র ও ধূম্রজাল- এসব কিছুর সমাহার থাকে। যাদুর প্রকৃত অস্তিত্ব রয়েছে। কোন যাদু মনের উপর আছর করে এবং কোনটা দেহের উপর। ফলে মানুষ কখনো অসুস্থ হয়ে পড়ে, কখনো নিহতও হয় এবং এর দ্বারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করা যায়। যাদুর এই আছর ও প্রতিক্রিয়া আল্লাহ তাআলার পার্থিব ও তাক্বদীরে নির্ধারিত হুকুম ও অনুমতি ক্রমেই হয়ে থাকে। আর এটা পুরোপুরি শয়তানী কাজ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যাদু -বিদ্যা আয়ত্ব করতে হলে শিরকের মাধ্যমে এবং অপবিত্র ও দুরাত্মাদের পছন্দনীয় কাজের মাধ্যমে তাদের নৈকট্য লাভের আশ্রয় নিতে হয়। এজন্যই শরীয়তে শিরকের সাথে যাদুর উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
اجْتَنِبُوا السَّبْعَ المُوبِقَاتِ قَالُوْا وَمَاهِيَ؟ قَالَ الإشْرَاكُ بِاللهِ وَالسِّحْرِ....
'সাতটি ধ্বংসাত্মক বস্তু থেকে বেঁচে থাক, সাহাবারা জিজ্ঞাসা করলেন সে গুলো কি? তিনি বললেন: আল্লাহর সাথে শরীক করা এবং যাদু.....'[১]

যাদু দু'ভাগে শিরকের অন্তর্ভুক্ত:

এক: এতে শয়তানদেরকে ব্যবহার করা হয়, তাদের সাথে সম্পর্ক রাখা হয় এবং তাদের পছন্দনীয় কাজের মাধ্যমে তাদের নৈকট্য অর্জন করা হয়, যাতে তারা যাদুকরের কাজ আঞ্জাম দেয়। সুতরাং যাদু শয়তানদের শিখানো বস্তু। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَكِنَّ الشَّيَاطِينَ كَفَرُوا يُعَلِّمُونَ النَّاسَ السِّحْرَ ﴿১০২﴾ سورة البقرة
'বরং শয়তানরাই কুফুরী করেছিল, তারা মানুষকে যাদু-বিদ্যা শিক্ষা দিত'[২]

দুই: এতে গায়েবী এলেম ও তাতে আল্লাহর সাথে শরীক হবার দাবী করা হয়, যা মূলত: কুফুরী ও ভ্রষ্টতা। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَقَدْ عَلِمُوا لَمَنِ اشْتَرَاهُ مَا لَهُ فِي الْآَخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ ﴿১০২﴾ سورة البقرة
'এবং তারা অবশ্যই জানে যে, যে কেউ তা খরিদ করে (অর্থাৎ যাদুর আশ্রয় নেয়) তার জন্য পরকালে কোন অংশ নেই'[৩]

আর পুরো ব্যাপারটা যেহেতু এমন, সুতরাং নি:সন্দেহে যাদু চর্চা কুফুরী ও শিরক, যা ইসলামী আক্বীদার পরিপন্থী এবং এর চর্চাকারীদের হত্যা করা ওয়াজিব, যেমন- একদল বড় বড় সাহাবী রাদি আল্লাহু আনহুম যাদুকরদের হত্যা করেছিলেন।

আজ কাল মানুষ যাদু ও যাদুকরদের ব্যাপারে ঢিলামি ও শৈথিল্য প্রদর্শন করছে। বরং হয়তো অনেকেই একে এমন এক শিল্প হিসাবে গণ্য করছে যা তাদের গর্বের বিষয় এবং এর চর্চাকারীদের উৎসাহিত করার জন্য তারা বহু পুরস্কার প্রদান করছে। যাদুকরদের সম্মানে তারা বিভিন্ন উৎসব ও প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করছে, যাতে হাজার হাজার দর্শক চিত্ত- বিনোদন ও উৎসাহ প্রদানের উদ্দেশ্যে উপস্থিত হয়ে থাকে। এসব কিছুই মূলত: দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞতা, আক্বীদার ব্যাপারে গাফিলতি ও শৈথিল্য প্রদর্শন এবং দ্বীন ও আক্বীদা নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলছে, তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়ারই নামান্তর।

২.ভাগ্য গণনা ও দৈব কর্ম:

এ উভয় ক্ষেত্রে গায়েবী এলেম ও অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে জানার দাবী করা হয়। যেমন ভবিষ্যতে পৃথিবীতে কি হবে এবং কি ফলাফল অর্জিত হবে, হারানো বস্তুর প্রাপ্তিস্থান কোথায় প্রভৃতি সম্পর্কে খবর দেয়া, যা তারা শয়তানদের মাধ্যমে জেনে থাকে। আর শয়তানরা চুরি করে শোনার মাধ্যমে আসমান থেকে এসব সংবাদ সংগ্রহ করে থাকে। আল্লাহ বলেন:
هَلْ أُنَبِّئُكُمْ عَلَى مَنْ تَنَزَّلُ الشَّيَاطِينُ ﴿২২১﴾ تَنَزَّلُ عَلَى كُلِّ أَفَّاكٍ أَثِيمٍ ﴿২২২﴾ يُلْقُونَ السَّمْعَ وَأَكْثَرُهُمْ كَاذِبُونَ ﴿২২৩﴾ سورة الشعراء
'আমি আপনিকে বলব কি, কার নিকট শয়তানরা অবতরণ করে? তারা অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক মিথ্যাবাদী, গুনাহ্‌গারের উপর। তারা শ্রুত কথা এনে দেয় এবং তাদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী.'[৪]

এটা এভাবে হয় যে, শয়তান ফিরিস্তাদের কিছু কথা চুরি করে শোনে এবং দৈবজ্ঞের কানে তা ঢেলে দেয়। অত:পর দৈবজ্ঞ এ কথার সাথে নিজের পক্ষ থেকে আরো শত মিথ্যা বানিয়ে তা পেশ করে। আর মানুষ আসমান থেকে শোনা সত্য কথাটির কারণে তার সকল মিথ্যাকে সত্য বলে মনে নেয়। অথচ শুধু আল্লাহরই গায়েব সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন। অতএব যদি কেউ দাবী করে যে, সে ভাগ্য গণনা ও দৈববিদ্যা বা অন্য কোন মাধ্যমে এই জ্ঞানে আল্লাহর সাথে শরীক অথবা কেউ এরকম দাবীদারকে সত্যবাদী মনে করে, তাহলে সে আল্লাহর জন্য যা খাস তাতে তাঁর শরীক স্থির করলো।

স্বয়ং দৈব কর্মও শিরক থেকে মুক্ত নয়। কেননা এতে শয়তানদের উদ্দেশ্যে তাদের প্রিয় জিনিস পেশ করে তাদের নৈকট্য অর্জন করা হয়। ফলে এতে আল্লাহর এলেমে তার শরীক হবার দাবী করার মাধ্যমে একদিকে যেমন রুবুবিয়াতে শিরক করা হচ্ছে, তেমনি অন্য দিকে কিছু ইবাদতের মাধ্যমে গায়রুল্লাহর নৈকট্য অর্জনের কারণে উলুহিয়াতেও শিরক করা হচ্ছে। আবু হোরায়রা রাদি আল্লাহু হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
مَنْ أتَى كَاهِناً فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُوْلُ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أنْرِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيهِ وَسَلَّمَ
'যে ব্যক্তি কোন দৈবজ্ঞ ও ভাগ্য গণনাকারীর কাছে আসে এবং সে যা বলে তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, সে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি অবতীর্ণ সত্যের প্রতি কুফুরী করল'[৫]

বর্তমানে এ ব্যাপারে নিজে সাবধান হওয়া ও লোকজনকে সাবধান করা জরুরি যে যাদুকর, ভাগ্য গণনাকারী, দৈবজ্ঞ সকলেই মানুষের আক্বীদা নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। তারা নিজেদেরকে চিকিৎসকরূপে পেশ করছে। আর রোগ- ব্যাধিগ্রস্ত লোকদেরকে গায়রুল্লার উদ্দেশ্যে যবেহ ও কুরবানী করার নির্দেশ প্রদান করছে। যেমন অমুক অমুক ধরনের বকরী বা মুরগী যেন তারা যবেহ করে।

অথবা তারা রোগীদেরকে শিরকী কবচ ও শয়তানী তাবীয লিখে দেয়। অত:পর তা কৌটায় পুরে রোগীদের গলায় ঝুলিয়ে দেয় কিংবা তাদের সিন্দুকে বা ঘরে রেখে দেয়।

কেউ কেউ আবার নিজেকে অদৃশ্য বিষয়ের সংবাদদাতা ও হারানো বস্তুর প্রাপ্তিস্থান অবহিতকারী হিসাবে জাহির করে। ফলে তার কাছে অজ্ঞ ও মূর্খ লোকেরা এসে হারিয়ে যাওয়া বস্তু সমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। অতঃপর সে তাদেরকে এ বস্তুর খবর দেয় কিংবা নিজেই তা শয়তান সহচরদের মাধ্যমে তাদের জন্য হাযির করে।

কেউ কেউ আবার নিজেকে অলৌকিক ক্ষমতা ও কারামাতের অধিকারী অলী হিসাবে প্রকাশ করে। যেমন সে অগ্নিতে প্রবেশ করে, অথচ আগুন তার উপর কোন আছর করে না। সে নিজেকে অস্ত্র দ্বারা আঘাত করে কিংবা গাড়ীর চাকার নীচে নিজেকে পিষ্ট করে, অথচ তার গায়ে আঘাত ও পিষ্ট হওয়ার কোন চিহ্নই থাকে না। এছাড়া সে আরো নানা ধরনের ভেলকি দেখিয়ে থাকে, যা প্রকৃত পক্ষে যাদু ও শয়তানী কাজেরই শামিল, যাতে কোন বাস্তবতাই নেই। বরং এগুলো গুপ্ত কৌশল ও ছলনা যা তারা মানুষের সামনে নিপুণভাবে উপস্থাপন করে। যেমন ফেরাউনের যাদুকররা লাঠি ও রশি দিয়ে যাদু দেখিয়েছিল।

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া কিছু সংখ্যক বাতায়েহী আহমাদী (রিফায়ী) নামধারী যাদুকরদের সাথে তার বিতর্ক প্রসঙ্গে বলেন,বাতায়েহীদের নেতা উচ্চস্বরে বলল: আমাদের এমন এমন অবস্থা ও বিষয়-আশয় রয়েছে। এরপর সে অগ্নি ইত্যাদির আছর দূর করার মত তাদের অলৌকিক শক্তির দাবী করে বসল এবং বলল যে, সে কারণে তাদের এই অবস্থাগুলো মেনে নেয়া উচিত। শায়খুল ইসলাম বলেন: আমিও তখন রেগে-মেগে উচ্চস্বরে বললাম যে, আমি দুনিয়ার পূর্ব পশ্চিমের সকল আহমদীকে বলতে চাই তারা আগুনে প্রবেশ করে যা করবে, আমিও হুবহু তাই করতে পারব। এতে যে পুড়ে যাবে সে পরাজিত হবে। বোধ হয় এও বলেছি যে, তার উপর আল্লাহর লা'নত বর্ষিত হবে। তবে এ কাজ করতে হবে আমাদের দেহ সিরকা ও গরম পানি দিয়ে ধৌত করার পর। এ কথা শুনে আমির উমারা ও সাধারণ লোকজন এর কারণ সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞাসা করল। আমি বললাম, আগুন নিয়ে এসব করার মধ্যে তাদের কিছু ছল-চাতুরী রয়েছে। তারা ব্যাঙের তেল, নারকেলের খোসা ও তালক নামক এক প্রকার পাথর দ্বারা কিছু জিনিস তৈরি করে শরীরে মাখে। এতে লোকজন হৈ-চৈ শুরু করে দিল। তা দেখে সে লোকটি জাহির করতে লাগলো যে, সে এমতাবস্থায় ও অগ্নিতে প্রবেশ করতে সক্ষম এবং বলল, আমাদের শরীর বারুদ দিয়ে মেখে আমাকে ও আপনাকে একটি কুঠুরিতে লেপ্টে রাখা হোক। আমি বললাম, চলুন ঠিক আছে। এ কাজ সম্পন্ন করার জন্য আমি বারবার তাকে তাগাদা দিতে লাগলাম। এতে সে হাত বাড়িয়ে জামা খোলার ভাব দেখাল। আমি বললাম, গরম পানি ও সিরকা দিয়ে গোসলের আগে নয়। এর পর অভ্যাসানুযায়ী সে স্বীয় ধারণা ব্যক্ত করে বলল, যে আমীরকে ভালোবাসে সে যেন কাঠ নিয়ে আসে অথবা বলল, সে যেন এক বোঝা লাকড়ি নিয়ে আসে। আমি বললাম, লাকড়ি আনতে গেলে দেরি হয়ে যাবে এবং লোকজন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়বে। ফলে উদ্দেশ্য হাসিল হবে না। তার চেয়ে বরং একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে আমার ও আপনার আঙুল ধুয়ে তাতে প্রবেশ করাই। এতে যার আঙুল পুড়ে যাবে তার উপর আল্লাহর লা'নত পড়বে অথবা বললাম, সে পরাজিত হবে। আমি এ কথা বললে সে বদলে গেল এবং লাঞ্ছিত ও অপমানিত হল[৬] এ ঘটনা বর্ণনার উদ্দেশ্য হল এ বিষয় স্পষ্ট করে তোলা যে, এসব দুষ্ট লোকেরা এ ধরনের গুপ্ত ছল-চাতুরী দিয়ে সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে মিথ্যা কথা পরিবেশন করে।

বদ নজর লাগা ও বদ নজরের কুপ্রভাব



• কুরআন থেকে (বদ নজরের) দলীলঃ

আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেনঃ
وَقَالَ يَا بَنِيَّ لَا تَدْخُلُوا مِنْ بَابٍ وَاحِدٍ وَادْخُلُوا مِنْ أَبْوَابٍ مُتَفَرِّقَةٍ وَمَا أُغْنِي عَنْكُمْ مِنَ اللَّهِ مِنْ شَيْءٍ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَعَلَيْهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُتَوَكِّلُونَ، وَلَمَّا دَخَلُوا مِنْ حَيْثُ أَمَرَهُمْ أَبُوهُمْ مَا كَانَ يُغْنِي عَنْهُمْ مِنَ اللَّهِ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا حَاجَةً فِي نَفْسِ يَعْقُوبَ قَضَاهَا وَإِنَّهُ لَذُو عِلْمٍ لِمَا عَلَّمْنَاهُ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
অর্থঃ এবং (ইয়াকুব আলাইহিস সালাম) বললেন হে আমার প্রিয় সন্তানগণ! তোমরা সবাই (শহরে) কোন এক প্রবেশ পথে প্রবেশ করো না বরং বিভিন্ন প্রবেশদ্বার দিয়ে প্রবেশ করিও । আমি তোমাদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা কোন বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারব না। কেননা প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী কেবল আল্লাহ। তার উপর আমার আস্থা রয়েছে। ভরসাকারীকে ভরসা করলে তার প্রতিই করতে হবে। আর যখন তারা দিয়েছিলেন অথচ আল্লাহ তায়ালার নির্ধারিত কোন কিছু থেকে কেউ রক্ষা করতে পারে না। তবুও ইয়াকুবের (আলাইহিস সালাম) অন্তরে একটি আশা ছিল যে, তিনি তা পূর্ণ করেছেন। নিশ্চয় তিনি ইলমে (নবুওয়াতের) বাহক ছিলেন। অথচ অনেক লোক তা জানে না। (সূরা ইউসুফঃ ৬৭-৬৮)

হাফেজ ইবনে কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) উপরোক্ত দু'টি আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, এটা সেই সময়ের ঘটনা যখন ইয়াকুব (আলাইহিস সালাম) ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর ভাই বিনইয়ামিনকে তার অন্য ভাইদের সাথে মিশরে পাঠিয়েছিলেন। আয়াতে ইয়াকুবের (আলাইহিস সালাম) উক্ত নির্দেশনার ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) মুহাম্মাদ বিন কা'ব, মুজাহিদ, যাহহাক, কাতাদা এবং সুদী (রাঃ) প্রমুখ বলেছেন যে, এমনটি তিনি বদ নজরের ভয়ে বলেছিলেন। কেননা তার সন্তানরা খুবই সুন্দর সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন। তাই তাদের উপর লোকদের বদনজরের আশঙ্কা করে উক্ত নির্দেশ দেন । কেননা বদনজরের ক্রিয়া বাস্তব; কিন্তু পরে তিনি এও বলেনঃ তবে এ ব্যবস্থা আল্লাহর তাকদীরকে প্রতিহত করতে পারবে না। তিনি যা চাবেন তাই হবে----------- পরিশেষে তা তাদের জন্য বদনজর হতে প্রতিরোধক হিসেবেই আল্লাহর হুকুমে কাজ হয়েছিল------- সংক্ষিপ্ত । (তাফসীর ইবনে কাসীরঃ ২/৪৮৫)

অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ
وَإِنْ يَكَادُ الَّذِينَ كَفَرُوا لَيُزْلِقُونَكَ بِأَبْصَارِهِمْ لَمَّا سَمِعُوا الذِّكْرَ وَيَقُولُونَ إِنَّهُ لَمَجْنُونٌ
অর্থঃ কাফিররা যখন উপদেশ বাণী (কুরআন) শ্রবণ করে তখন তারা যেন তাদের তীক্ষ্ম দৃষ্টি দ্বারা তোমাকে আছড়িয়ে ফেলতে চায় এবং বলেঃ সে তো এক পাগল। (সূরা কলামঃ ৫১)

হাফেজ ইবনে কাসীর (রাহেমাহুল্লাহ) ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) এবং মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেন যে, (لَيُزْلِقُونَكَ) “তোমার প্রতি বদনজর দিবে।” অর্থাৎ তারা তোমাকে হিংসার প্রতিফলন ঘটিয়ে রুগী বানিয়ে দিবে যদি আল্লাহর তোমার প্রতি হেফাযত না থাকে। আয়াতটি প্রমাণ বহন করে যে, বদনজরের কুপ্রভাবের বাস্তবতা রয়েছে, আল্লাহর হুকুমে। যেমন এ ব্যাপারে হাদীসও রয়েছে। (তাফসীর ইবনে কাসীরঃ ৪/৪১০) 

• হাদীসসমূহ থেকে (বদ নজরের) প্রমাণঃ

১। আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেনঃ
عن ابى هريرة قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم العين حق
বদ নজর সত্য। (বুখারীঃ ১০/২১৩) 
অর্থাৎ এর বাস্তবতা রয়েছে, এর কুপ্রভাব লেগে থাকে।

২। আয়েশা সিদীকা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বর্ণনা করেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ
استعيذوا بالله من العين فإن العين حق
তোমরা বদ নজরের ক্রিয়া (খারাপ প্রভাব) থেকে রক্ষার জন্যে আল্লাহ তায়ালার সাহায্য প্রার্থনা কর। কেননা তা সত্য। (ইবনে মাযাহঃ ৩৫০৮)

৩। ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বর্ণনা করেন যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ
العين حق ولو كان شيء سابق القدر لسبقته العين ، وإذا استغسلتم فاغسلوا
বদ নজর (এর খারাপ প্রভাব) সত্য এমনকি যদি কোন বস্তু ত্বাকদীরকে অতিক্রম করত তবে বদ নজর তা অতিক্রম করত। সুতরাং তোমাদেরকে যখন (এর প্রভাবমুক্ত হওয়ার জন্যে) গোসল করতে বলা হয় তখন তোমরা গোসল কর । (মুসলিমঃ ১৪/১৭১)

৪। আসমা বিনতে উসাইম (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত যে, তিনি নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট আবেদন করনে যে, জাফরের সন্তানদের নজর লাগে আমি কি তাদের জন্যে ঝাড়ফুঁক করব? উত্তর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ
نعم فلو كان شئ سابق القضاء لسبقته العين
অর্থঃ হ্যাঁ! কোন বস্তু যদি তাকদীরকে অতিক্রম করত তবে বদ নজর তা অতিক্রম করত। (তিরমিযীঃ ২০৫৯, আহমদঃ ৬/৪৩৮) 

৫। আবু যর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন যে, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ
ان العين لتولع بالرجل بإذن الله حتى يصعد حالقا فيتردى منه
ইমাম আহমদ ও আবু ইয়ালা বর্ণনা করেছেন । এই হাদীসের সারমর্ম হল, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
কোন ব্যক্তির যখন নজর লাগে তখন এত বেশি প্রভাবিত হয় যে, সে যেন কোন উচু স্থানে চড়ল অতঃপর কোন নজর দ্বারা হঠাৎ করে নীচে পড়ে গেল। (শায়খ আলবানী সহীহ বলেছেনঃ ৮৮৯)

৬। ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ
العين حق تستنزل الحالق
অর্থঃ বদ নজর ত্যি তা যেন মানুষকে উপর থেকে নীচে ফেলে দেয়। (ইমাম আহমদ ও তা রানী আলবানী হাসান বলেছেনঃ ১২৫০)

৭। জাবের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ
العين تدخل الرجل القبر وتدخل الجمل القدر
অর্থঃ বদ নজর মানুষকে কবর পর্যন্ত পৌছে দেয় এবং উটকে পাতিলে । (সহীহ আল জামেঃ শাইখ আলবানী (রহঃ) সহীহ বলেছেনঃ ১২৪৯)

অর্থাৎ মানুষের নজর লাগায় সে মৃত্যুবরণ করে, যার ফলে তাকে কবরে দাফন করা হয়। আর উটকে যখন বদ নজর লাগে তখন তা মৃত্যু পর্যায়ে পৌছে যায় তখন সেটা যবাই করে পাতিলে পাকানো হয় ।

৮ । জাবের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ
أكثر من يموت من أمتي بعد قضاء الله وقدره بالعين
অর্থঃ আমার উম্মতের মধ্যে তাকুদীরের মৃত্যুর পর সর্বাধিক মৃত্যু বদ নজর লাগার দ্বারা হবে। (বুখারী)

৯ । আয়েশা সিদীকা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে বদ নজর থেকে বাচার জন্যে ঝাড়-ফুক করার নির্দেশ দিতেন। (বুখারীঃ ১০/১৭০, মুসলিমঃ ২১৯৫)

১০ । আনাস বিন মালেক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নজর থেকে হেফাযত ও বিষাক্ত প্রাণীর দংশন ও ক্ষত বিশিষ্ট রোগ থেকে রক্ষার জন্যে ঝাড়-ফুকের অনুমতি প্রদান করেছেন। (মুসলিমঃ ২১৯৬)

১১। উম্মে সালমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার ঘরে এক মেয়ে শিশুর চেহারায় দাগ দেখে তিনি বলেছেন যে, তার চেহারায় বদ নজরের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তাকে ঝাড়-ফুক করাও। (বুখারীঃ ১/১৭১, মুসলিমঃ ৯৭)

১২। জাবের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আলে হাযমকে সাপে দংশিত ব্যক্তির ঝাড়-ফুকের অনুমতি প্রদান করেছেন। আর আসমা বিনতে উমাইসকে বললেন, কি ব্যাপার আমার ভাইয়ের সান্তানদেরকে দুর্বল দেখছি, তাদের কি কিছু হয়েছে? আসমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বললেন না, কিছু হয়নি তবে বদ নজর তাদেরকে দ্রুত লেগে যায়। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তাদেরকে ঝাড়-ফুক করাও অতঃপর তাকে তার সামনে নিয়ে আসা হলোঃ তিনি বলেন, তাদেরকে ঝাড়-ফুক কর। (ইমাম মুসলিম রেওয়ায়েত করেছেনঃ ২১৯৮)

বদ নজর সম্পর্কে মনীষীদের মতামত

* ইবনে কাসীর (রহঃ) বলেনঃ বদ নজরের প্রতিক্রিয়া হওয়া সত্য যা আল্লাহর নির্দেশেই হয়ে থাকে। (তাফসীর ইবনে কাসীরঃ ৪/৪১০)

* হাফেজ ইবনে হাজার (রহঃ) বলেনঃ বদনজরের মূল বিষয় হল কোন উত্তম বস্তুকে কোন নিকৃষ্ট চরিত্রের ব্যক্তি হিংসার চোখে দেখে । যার ফলে সেই মানুষ অথবা যে কোন প্রাণী, যে কোন ধরণের বস্তুর ক্ষতিসাধিত হয় । (ফতহুল বারীঃ ১০/২০০)

* ইবনে আসীর (রহঃ) বলেনঃ বলা হয় (اصابت فلانا عين) অর্থাৎ অমুককে চোখ লেগেছে এটা তখন বলা হয়, যখন কারো প্রতি কোন শক্র অথবা হিংসুক দৃষ্টিপাত করে, আর এর ফলে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে।” (আন নিহায়াঃ ৩/৩২)

* হাফেজ ইবনে কাইয়্যিম (রহঃ) বলেনঃ কতিপয় ব্যক্তিবর্গ নিজের জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে বদ নজরের অস্তিত্বকে অস্বীকার করেছেন এবং তারা বলেছেন যে, এর কোন সত্যতা নেই এটা কেবল কুসংস্কার ও ভুল ধারণা। যুগ যুগের জ্ঞানীজনেরা একে অস্বীকার করেনি, যদিও তারা তার কারণ ও দিক নিয়ে মতভেদ করেছেন।

তিনি আরও বলেন যে, আল্লাহ তায়ালা মানুষের শরীর ও আত্মায় বিভিন্ন প্রকারের ক্ষমতা ও প্রাকৃতিক ক্রিয়াশীল দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। আর এদের ভেতর অপরকে প্রভাবিত করার ক্ষমতাও দিয়েছেন। আর কোন জ্ঞানী ব্যক্তি শরীর ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে আত্মার প্রতিক্রিয়ার অস্বীকার করতে পারবে না, কেননা এটা এমন একটি বিষয় যা আমরা দৈনন্দিন জীবনে পরিলক্ষিত ও অনুভব করতে পারি। যেমন মানুষের চেহারা লাল রং ধারণ করে যখন তার দিকে কোন লজ্জাকারী ব্যক্তির দৃষ্টি পড়ে। তেমনি ভাবে ভয়ের কিছু দেখলে হলদে রং ধারণ করে। আর লোকজন বাস্তবে দেখতে পেয়েছে যে, বদ নজরের জন্যে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে। আর এসব আত্মার প্রভাবে হয়ে থাকে। আর যেহেতু আত্মার সম্পর্ক চোখের সাথে খুবই গভীর এজন্য এটাকে চোখ লাগা বলা হয় কিন্তু চোখের নিজস্ব এমন কোন প্রভাব নেই বরং প্রতিক্রিয়া কেবল আত্মার মাধ্যমে হয়ে থাকে। আর আত্মার মতা, প্রকৃতি ও এর গুণ বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে। সুতরাং হিংসুক থেকে হিংসার মাধ্যমে হিংসাকৃতের উপর স্পষ্ট কষ্টের প্রভাব পড়ে।

এজন্য আল্লাহ তায়ালা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তিনি যেন হিংসাকারীদের থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে।

বদনজর কখনও যোগাযোগে হয় আর কখনও সামনা সামনি হয় কখনও দৃষ্টিপাতে, আবার কখনও আত্মার দ্বারা ঘায়েল করে আর কখনও এর প্রভাব বদ দুআ ও তাবীজের মাধ্যমে হয়ে থাকে। আর কখনও ধ্যানের মাধ্যমে হয়।

পূর্বে যেমন উল্লেখ করা হয়েছে যে, বদ নজর কেবল দৃষ্টির দ্বারা হয় না বরং কখনও অন্ধ ব্যক্তিরও বদ নজর লাগে আর তা এভাবে যে, তার সামনে কারো প্রশংসা বর্ণনা করা হয় আর তা শুনে অন্ধ ব্যক্তির আত্মা সেই প্রশংসিত ব্যক্তির উপর প্রভাব বিস্তার লাভ করে । এটা একটা বিষাক্ত তীরের ন্যায় যা বদ নজরকারী ব্যক্তির আত্মা হতে বের হয়ে অন্য ব্যক্তির উপর আঘাত হানে। আর এই তীরের লক্ষ্য বস্তু কখনও সঠিক হয় আবার কখনও হয় না। এর একটি উদাহরণ এমন যেমন কোন আক্রমণকারী এমন বক্তির উপর যদি আক্রমণ করে, যার গায়ে সুরক্ষিত যুদ্ধ পোশাক থাকে তবে আঘাতে তার শরীর আহত হবে না। তেমনি যদি দু'আ পড়ে সে যদি সুরক্ষিত থাকে তবে ক্রীয়া হবে না। আর যদি খালি গায়ে থাকে তবে আঘাত তার শরীরে হবে। আর কখনও এমন হয় যে, তীর ব্যবহারকারীর তীর শক্রর উপর আঘাত না হেনে বরং তীর ব্যবহারকারীর শরীরকেই উল্টো আঘাত করে বসে। তেমিনভাবে কখনও বদ নজর যে লাগায় উল্টো তার উপর আঘাত হানতে পারে। আর কখনও বা অনিচ্ছায় নদ নজর লেগে যায়।


অতএব এর প্রকৃতি হলো বদ নজরকারীর আশ্চর্য হয়ে চোখ লাগানো এরপর তার খবীস আত্মা তার অনুসরণ করে যা তার বিষাক্ত দৃষ্টিকে সহযোগিতা করে। কখনও মানুষ নিজেকেই বদনজরে মেরে থাকে, কখনও তার ইচ্ছার বাইরেও বদনজর লেগে থাকে। (যাদুল মা’আদ থেকে সংক্ষিপ্তাকারেঃ ১/১৬৫)

বদ নজর ও হিংসার মধ্যে পার্থক্য

১ । প্রত্যেক বদ নজরওয়ালা হিংসুক; কিন্তু প্রত্যেক হিংসুক বদ নজর ওয়ালা নয়। এজন্য সূরা ফালাকে হিংসাকারীর অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয়ের কথা বর্ণিত হয়েছে। যাতে হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আল্লাহ তায়ালার আশ্রয় প্রার্থনা করার ফলে সে বদ নজর থেকেও রক্ষা পায়। আর এটিই হলো কুরআনের ব্যাপকতা এবং তার মোজেযা ও অলংকারিত্ব।

২। হিংসার মূল বিষয় হল বিদ্ধেষ এবং অপরের নেয়ামত ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা হয়ে থাকে। অন্যদিকে বদ নজরের মূল বিষয় হল অন্যের কোন কিছুকে খুব ভাল মনে করা।

৩ । হিংসা এবং বদ নজরের পরিণাম একই যার ফলে উভয়ই ক্ষতিসাধনের কারণ হয়ে থাকে; কিন্তু উভয়ের উৎসের পার্থক্য রয়েছেঃ হিংসার উৎস অন্তরের জ্বলন সৃষ্টি হওয়া এবং সম্পদ নষ্ট হয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকে। আর বদ নজরের উৎস চোখের দৃষ্টি শক্তির খারাপ প্রভাব এজন্য নজর দ্বারা এমন সব জিনিসও প্রভাবিত হয় যার উপর হিংসার ক্ষেত্র নেই যেমন জড় পদার্থ, প্রাণীসমূহ, উদ্ভিদসমূহ এবং চাষাবাদ ও সম্পদ। আর কখনও নিজের নজর নিজেকেই লেগে যায়। কোন ব্যক্তি যখন কোন বস্তুকে আশ্চর্যের সাথে এবং গভীর দৃষ্টিতে দেখে এবং সাথে সাথে তার আত্মা ও অন্তর এক প্রকারের চাঞ্চল্যের অবস্থা সৃষ্টি হয় তখন তা দ্বারা বদ নজর লেগে থাকে।

৪ । হিংসার প্রভাব ভবিষ্যতের কোন ভাল জিনিসের উপরও হয়ে থাকে আর বদ নজরের প্রভাব বর্তমান উপস্থিত বিষয়ের উপর হয়ে থাকে।

৫। কোন ব্যক্তি নিজেকে এবং নিজের সম্পদকে হিংসার দৃষ্টিতে দেখে না, তবে তার নিজের সম্পদসমূহে ও শরীরে নিজের বদনজর লেগে যেতে পারে।

৬। হিংসা নিকৃষ্ট হৃদয়ের মানুষ থেকেই হয়। প্রকারান্তরে বদ নজর নেক ব্যক্তির দ্বারাও হয়ে থাকে। যখন সে কোন বস্তুকে খুব বেশী পছন্দ করে ফেলে অথচ সে সেটার ধ্বংস চায় না। এর উদাহরণ আমের বিন রাবীয়ার ঘটনা যখন সাহাল বিন হুনাইফকে তার নজর লেগে যায় অথচ আমের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) প্রথম যুগের মুসলমান ও আহলে বদরের অন্তর্ভুক্ত।

উপরোক্ত নজর ও হিংসার মধ্যে পার্থক্য যারা বর্ণনা করেছেন তারা হলেনঃ ইবনে জাওযী, ইবনে কাইয়্যিম, ইবনে হাজার, নববী (রহঃ) ও প্রমুখ। আল্লাহ তায়ালা তাদের সকলের প্রতি দয়া ও রহমত করুন।

মুসলমানদের উচিত যখন কোন কিছু দেখে পছন্দ হয়ে যায়; তখন বরকতের দু'আ করা, সেই বস্তু নিজের হোক অথবা অন্যের কেননা নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমেরকে বলেছিলেন, তুমি তার জন্যে (সাহাল বিন হুনাইফের জন্যে) বরকতের দু'আ করনি? কেননা এই দু'আ বদ নজর থেকে সুরক্ষা হয়ে থাকে।


জ্বিনের বদ নজর মানুষকে লাগতে পারে

আবু সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জ্বিনের নজর থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন এবং এরপর মানুষের বদ নজর থেকেও পানাহ চাইতেন; সুতরাং যখন সূরা ফালাক ও নাস অবতীর্ণ হল তখন অন্য দু'আ ছেড়ে দিয়ে এই সূরাদ্বয় দিয়ে প্রার্থনা করতেন। (ইমাম তিরমিয়ী চিকিৎসা বিষয়ক অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেনঃ ২০৫৯, ইবনে মাযাহঃ ৩৫১১, আর আলবানী এটাকে সহীহ বলেছেন।)

২। উম্মুল মু'মিনীন উম্মে সালামা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার ঘরে একটি বালিকা দেখলেন, যার মুখমন্ডলে জ্বিনের বদনজরের কাল দাগ। তা দেখে তিনি বলেনঃ তাকে ঝাড়-ফুক কর কেননা তাকে জিনের বদনজর লেগেছে।” (বুখারীঃ ২০১০/১৭১ ও মুসলিমঃ ২১৯৭)

উপরোক্ত হাদীসদ্বয় হতে বুঝা যায়, মানুষ হতে যেমন বদনজর লাগে অনুরূপ জ্বিন হতেও লাগে। এজন্য প্রত্যেক মুসলমানের উচিত সে যখন পোশাক খুলবে, আয়না দেখবে বা সে যে কর্ম করবে তখন যেন দু'আযিকির পড়ে যাতে সে নিজের, মানুষের ও জিনের বদনজর বা অন্য কোন কষ্ট হতে নিরাপদ বা সংরক্ষিত থাকতে পারে।


বদ নজরের চিকিৎসা

এর চিকিৎসার বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছেঃ

প্রথম পদ্ধতিঃ 

যে ব্যক্তি নজর লাগিয়েছে যদি তার সম্পর্কে জানা যায় তবে তার গোসল করা পানি নিয়ে রোগীর পিঠে ঢেলে দিবে। তাতে আল্লাহ তায়ালার হুকুমে সে আরোগ্য লাভ করবে।

আবু উমামা বিন সাহাল বিন হুনাইফ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ আমার পিতা সাহাল বিন হুনাইফ মদীনার খাররার নামক উপত্যকায় গোসল করার জন্যে প্রস্তুতি নিলেন। যখন তিনি গোসলের জন্যে জামা খুললেন তখন তার শরীরে আমের বিন রাবীয়ার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) দৃষ্টি পড়ে। যেহেতু সাহাল বিন হুনাইফ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) সুন্দর ও সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন, তাই আমের দেখামাত্র বলে উঠল। আজকের মত এমন (সুন্দর) আমি চামড়া কখনও দেখিনি; এমন কি অন্দর মহলের কুমারীদেরও না। তার একথা বলার সাথে সাথে সাহাল তৎক্ষণাৎ বেহুশ হয়ে পড়ে যায় এবং প্রচন্ড আকারে রোগে আক্রান্ত হয়ে যায়। এরপর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে বিষয়টি জানানো হয় এবং বলা হল যে, সে তার মাথা উঠাতে পারছে না।

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন তোমরা কি কারো প্রতি বদ নজরের সন্দেহ কর? উত্তরে লোকজন বলল, হ্যাঁ আমের বিন রাবীয়ার উপর সন্দেহ হয়। এটা শুনে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে ডেকে পাঠালেন এবং তার উপর রাগাম্বিত হয়ে বললেন, কেন তোমাদের মধ্যে কেউ নিজের ভাইকে হত্যা করে। তুমি তার জন্যে বরকতের দু'আ কেন করনি? এখন তার জন্যে গোসল কর। অতঃপর আমের নিজের হাত, চেহারা, দু'পা, দু'হাটু, দু’কনুই ও লুঙ্গীর আভ্যন্তরীণ অংশ একটি পাত্রে ধৌত করলেন । অতঃপর সেই পানি সাহাল বিন হুনাইফের পিঠে ঢেলে দেয়া হল। এরপর সাথে সাথে সুস্থ হয়ে গেল। (এই (রাহেমাহুল্লাহ) সহীহ বলেছেন।)

লুঙ্গীর আভ্যন্তরীন অংশ নিয়ে আলেমগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। কেউ বলেন, তা দ্বারা শরীরের অংশ বুঝানো হয়েছে। আর কেউ এটাও বলেছেন যে, এর অর্থ লজ্জাস্থান। এটাও বলা হয়েছে যে, কোমর কাজী ইবনুল আরবী বলেন এর দ্বারা লুঙ্গীর নিম্নের সংশ্লিষ্ট অংশ বুঝানো হয়েছে।


বদ নজরের গোসলের পদ্ধতি

ইবনে শিহাব যুহরী বলেন, গোসলের পদ্ধতি যা আমরা আমাদের উলামাদের নিকট থেকে শিখেছি তা হলঃ যে ব্যক্তির পক্ষ হতে নজর লেগেছে তার সামনে এক পাত্র পানি দেয়া হবে। এরপর সেই ব্যক্তি পানি নিয়ে পাত্রে কুলি করবে। এরপর পাত্রে নিজের মুখ ধুবে। বাম হাতে ঢেলে ডান হাতের কজি ও ডান হাতে ঢেলে বাম হাতের কজি পর্যন্ত একবার করে ধৌত করবে, তারপর বাম হাত দিয়ে ডান কুনুই এবং ডান হাত দিয়ে বাম কনুইয়ে ঢালবে। এরপর বাম হাতে ডান পায়ে আর ডান হাতে বাম পায়ে ঢালবে। এরপর বাম হাতে ডান পায়ের হাঁটু আর ডান হাতে বাম পায়ের হাঁটুতে ঢালবে। আর সব যেন পাত্রে হয়। এরপর লুঙ্গী বা পায়জামার ভেতরের অংশ পাত্রে ধৌত করবে নিচে রাখবে না । অতঃপর সকল পানি রোগীর মাথায় একবারে ঢালবে। (ইমাম বায়হাকীর সুনানে কুবরাঃ ৯/২৫২)


এই গোসলের বিধিবদ্ধতার প্রমাণঃ

১। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ নজর লাগা সত্য, আর কোন কিছু যদি তাকদীরকে অতিক্রম করত তবে তা বদ নজর হত। আর তোমাদের মধ্যে কাউকে যখন (এর জন্য) গোসল করতে বলা হয় তখন সে যেন গোসল করে। (ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেনঃ ৫/৩২)

২। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন যে,  [নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর যুগে] নজর যে ব্যক্তি লাগিয়েছে তাকে ওযু করতে বলা হত। আর সেই ওযু করা পানি দিয়ে নজর লাগা ব্যক্তিকে গোসল দেয়া হত।" (আবু দাউদঃ ৩৮৮০ সহীহ সূত্র)

উল্লেখিত হাদীসদ্বয় দ্বারা নজরকৃত ব্যক্তির জন্য বদ নজরকারীর ওযু ও গোসল সাব্যস্ত হয়।

চিকিৎসার দ্বিতীয় পদ্ধতিঃ

রোগীর মাথায় হাত রেখে নিম্নের দু'আ পড়ুনঃ
بسم الله أرقيك ولله يشفيك من كل داء يؤذيك ومن كل نفس أو عين حاسد الله يشفيك بسم الله أرقيك
অর্থঃ আল্লাহর নামে তোমায় ঝাড়-ফুক করছি। আর আল্লাহই তোমাকে কষ্টদায়ক রোগ থেকে মুক্তি দিবেন। আর সকলের অনিষ্ট ও হিংসুক বদ নজরকারীর অনিষ্ট থেকে তোমাকে আরোগ্য দিবেন। আল্লাহর নামে তোমাকে ঝাড়ছি। (মুসলিমঃ ২১৮৬)

তৃতীয় পদ্ধতিঃ

রোগীর মাথায় হাত রেখে এই দু'আ পড়ুনঃ
بسم الله يبريك من كل داء يشفيك ومن شر حاسد اذا حسد ومن شر كل ذى عين
অর্থঃ আল্লাহর নামে ঝাড়ছি, তিনি তোমাকে মুক্ত করবেন এবং তিনিই প্রত্যেক রোগ থেকে তোমাকে আরোগ্য দিবেন এবং হিংসাকারীর হিংসার অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে এবং সকল বদ নজরের অনিষ্ট থেকে আল্লাহ তোমায় রক্ষা করুক। (মুসলিমঃ ২১৮৬)

চতুর্থ পদ্ধতিঃ

রোগীর মাথায় হাত রেখে এই দু'আ পড়ুনঃ
اللهم رب الناس أذهب البأس واشف أنت الشافي لا شفاء إلا شفاؤك شفاء لا يغادر سقما
অর্থঃ হে আল্লাহ! মানবজাতির প্রভু তার কষ্ট দূর করে দাও এবং সুস্থ করে দাও। কেবল তুমিই রোগমুক্তির মালিক তোমার চিকিৎসা ব্যতীত আর কোন চিকিৎসা নেই তুমি এমন সুস্থ করে দাও যেন কোন রোগ না থাকে। (বুখারী কিতাবুত ত্বিব)

পঞ্চম পদ্ধতিঃ

বদনজরের রোগীর ব্যথার স্থানে হাত রেখে নিম্নের সূরা গুলো পড়ে ঝাড়বেঃ সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাসঃ
(قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ وَمِنْ شَرِّ غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ وَمِنْ شَرِّ النَّفَّاثَاتِ فِي الْعُقَدِ وَمِنْ شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ)
(قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ مَلِكِ النَّاسِ إِلَٰهِ النَّاسِ مِنْ شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ)


বদ নজরের চিকিৎসার কতিপয় বাস্তব উদাহরণ

প্রথম উদাহরণঃ বাচ্চা মায়ের স্তন মুখে দেয় না
আমি এক স্থানে আমার আত্মীয়ের সাথে সাক্ষাতে গেলাম। তারা আমাকে এক শিশুর বিষয়ে জানাল যে, কয়েক দিন হল সে মার দুধ পান করা ছেড়ে দিয়েছে, অথচ কিছুদিন পূর্বেই সে তার মার দুধ স্বাভাবিকভাবে পান করত । আমি তাদেরকে বললাম শিশুটিকে আমার কাছে নিয়ে আস। তারা শিশুটিকে আমার কাছে নিয়ে আসলে আমি কিছু মাসনুন দু'আ এবং সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে ঝাড়-ফুক করলাম এবং আমি বললাম এবার শিশুটিকে তার মার কাছে নিয়ে যান। শিশুটিকে মার কাছে নিয়ে গেল এবং ফিরে এসে আমাকে সুসংবাদ দিল যে, শিশুটি এখন মার স্ত ন মুখে গিলে দুধ পান করছে। আলহামদুলিল্লাহ এটা সম্পূর্ণই আল্লাহর মেহেরবানী । এতে তার শক্তি ও সামর্থ ব্যতীত কারো কোন ক্ষমতা নেই।


দ্বিতীয় ঘটনাঃ বালকের বাক শক্তি রুদ্ধ
একটি বালক কথা বলা বন্ধ করে দেয়ঃ সে মাধ্যমিক মডেল স্কুলের অত্যান্ত মেধাবী ও মিষ্টভাষী শিশু যার খ্যাতি ছড়িয়ে গিয়েছিল। সে গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখত। একদিন তার গ্রামে কারো মৃত্যুতে শোকাহত ব্যক্তিদের সান্তনার জন্যে গেল। সেখানে হামদ ও সানার পর সে অতি প্রাঞ্জল ভাষায় বক্তব্য দেয়। এরপর যখন সে বাড়ি ফিরে সে রাতেই বোবা হয়ে গেল। তার বাবা তাকে হাসপাতাল নিয়ে গেল। ডাক্তারগণ চেকআপ করে কিছুই পেল না। এরপর তার বাবা তাকে আমার কাছে নিয়ে আসল আমি তাকে দেখে হতবাক হলাম, আমার চোখে পানি এসে গেল কেননা আমি তার বিষয়ে জানতাম। নিজেকে সামলে নিয়ে আমি তার বাবার কাছে ঘটনা জানতে চাইলে তিনি আমাকে সব বললেন আর বালকটি নিচুপ দাড়িয়ে আছে। আমি বুঝতে পারলাম যে, ছেলেটির উপর বদ নজর পড়েছে। আমি সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে তার উপর ঝাড়-ফুক করলাম এবং বদ নজরের দু'আগুলো ও আয়াত পড়ে পানিতে ফু দিয়ে তার বারাকে দিয়ে বললাম এই পানি সাতদিন পর্যন্ত ছেলেটিকে পান করাবেন এবং তা দিয়ে গোসল করাবেন। এরপর আমার কাছে আসবেন। যখন সাত দিন পর ছেলেটি আমার কাছে আসল তখন সে আলহামদুলিল্লাহ পরিপূর্ণ সুস্থ এবং পূর্বের ন্যায় কথা বলতে থাকে। এরপর আমি তাকে বদ নজর থেকে হেফাজতের জন্যে সকাল-সন্ধ্যার দু'আগুলো শিখিয়ে দিলাম। (রুগী সম্মানিত লিখকের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের সরাসরি ছাত্র। সৌদি আরবের আবহাতে শিক্ষকতা অবস্থায় তিনি তাকে পড়ান)


তৃতীয় উদাহরণঃ এই ঘটনাটি আমার নিজের বাড়ির
সংক্ষেপে ঘটনাটি হল, এক ব্যক্তি এবং এক বৃদ্ধ মহিলা আমাদের কাছে আগমন করলেন। মহিলা আমার স্ত্রীর কাছে গিয়ে বসলেন আর পুরুষটি আমার কাছে এসে বসল এবং তার মার ঘটনা বলতে লাগল। এরপর আমি তার মাকে আমার কাছে ডাকলাম এবং কিছু দু'আ পড়ে তাকে ঝাড়লাম। এরপর তারা চলে গেল।

হঠাৎ কিছুক্ষণ পর দেখি যে, ছোট ছোট সাদা সাদা পোকা ঘরের সব স্থানে ছেয়ে গেছে। আমি ভাবলাম এসব পোকা কোথা হতে আসল। আমি হতাশায় পড়ে গেলাম। আমার স্ত্রী অনেকবার ঝাড়ু দিয়ে পরিস্কার করতে থাকল কিন্তু মুহুর্তেই আবার ঘর ভরে যায়। আমি আমার স্ত্রীকে বললাম ভেবে দেখ এমনটি কেন হচ্ছে? আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম সেই বৃদ্ধ মহিলা তোমাকে কি বলছিল? উত্তরে সে বলল যে, বৃদ্ধা আমাদের বাড়ির চতুর্দিকে শুধু লম্বা লম্বা দৃষ্টি দিয়ে তাকাচ্ছিল; কিন্তু কোন কিছু বলছিল না। আমি বুঝে গেলাম যে, এসব বদ নজরের জন্যেই হয়েছে। যদিও আমাদের বাড়ি খুবই সাধারণ ও সাদা সিধে। হয়ত বৃদ্ধ মহিলা কোন গ্রামের বাসিন্দা ছিল, যে শহর কখনও দেখেনি।


মূলকথা হল যে, আমি এক পাত্র পানি নিয়ে বদ নজর নষ্টের জন্যে দুআ পড়ে পানিতে ফু দিলাম। আর সমস্ত পানি ঘরে ছিটিয়ে দিলাম। এরপর মুহুর্তেই সমস্ত পোকা গায়েব হয়ে গেল। আর বাড়ির সকল স্থান পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসল। আলহামদুলিল্লাহ।