ভ্যালেন্টাইন দিবসের প্রতিচ্ছবি:-


ভ্যালেন্টাইন দিবসকে সামনে রেখে চারিদিকে যেন উজ্জল লাল ও গোলাপি রং এর মেলা চলছে। কাপড়ের বিপনি বিতান গুলোতে দেখা যায় দামী ও ভারিক্কি লাল কাপড়ের সমারোহ, ফুলের দোকানে লাল গোলাপের দাম তাই চড়া, উপহারের বিভিন্ন দোকানে সুন্দর সুন্দর টেডি বিয়ারগুলির গায়ে গোলাপি কিংবা লাল রংয়ের সুদৃশ্য হার্টের প্রতিকৃতি দিয়ে সাজানো। অলংকার ও ঘড়ি গুলোকে উপস্থাপন করা হয়েছে ভালোবাসা নিয়ে কোন লিখনী বা মনরঞ্জক কোন উক্তি দিয়ে। এমনকি মিষ্টির দোকানেও দেখা যাচ্ছে হার্টের আকৃতি সম্বলিত কেক বা চকোলেট এর ব্যাবস্থা করতে, তাতে আবার অনুরোধ বা অর্ডারের ভিত্তিতে চকমকে গোলাপি কাভারে সাজানোর ব্যাবস্থাও আছে।
দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, এ দিবসটি শুধু পাশ্চাত্যের দেশগুলোতেই নয় বরং প্রায় সবকটি মুসলিম দেশেই পালন করা হচ্ছে!
অভিবাবকদের চোখের আড়ালে তরুনদলের অনেকেই তাদের বিপরীত লিঙ্গের কারও সাথে দিনটিকে উদ্‌যাপন করবে বলে নানা রকম পূর্ব পরিকল্পনায় মত্ত থাকে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার দল বেঁধে একাজ করার পরিকল্পনা আঁটে! আবার কেউ কেউ এ দিনটিতে একটু ভিন্নতা এনে নিজ ভাই বা বোন বা বাবা-মাকেও অভিবাদন জানায় বা শুভ কামনা বিনিময় করে থাকে।
এই দিনটির পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে তাদের অনেককে বিশেষ পোশাক কিনতে দেখা যায়। টি-শার্ট, জুতা, অলংকার, নানা রকম আকর্ষনীয় পোশাকের বাহার, উঁচো হাই হিলের সাথে ম্যাচ করে লাল নেইল পলিস আরো কত কি! ওহ, লাল রংয়ের চকচকে হার্টের ছোট্ট একটি প্রতিকৃতি সংগ্রহ করতেও তারা ভুলে না।
সুবহানআল্লাহ্‌, চারিদিকে এসব ব্যাপার অবলোকন করে; মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর সময়ের একটি ঘটনা স্মরণ করা যেতে পারে।
একজন যুবক নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর নিকট আসলো এবং বল্লো, “ও আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)! আমি আপনাকে আমার নিজের প্রানের, পরিবারের এবং সন্তানদের থেকেও বেশী ভালবাসি। যখন আমি ঘরে থাকি আর মাঝে মাঝে যখন আপনার কথা মনে পড়ে তখন আপনার নিকট এসে আপনাকে না দেখা পর্যন্ত আমার অন্তর শান্তি পায় নাহ। যখন আমি আমার ও আপনার মৃত্যু পরবর্তী জীবন সম্পর্কে ভাবি তখন আমার এই ধারনা হয় যে, আপনি জান্নাতে থাকবেন নবীদের সাথে আর আমার তাই ভয় হয়, আমি যদি জান্নাতে প্রবেশ করি তাহলে হয়ত আপনাকে দেখতে পাবো নাহ।” নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) প্রতিউত্তর করলেন না, নিরব থাকলেন। কিন্তু মহান আল্লাহ্‌ ঐ যুবককে উদ্দেশ্য করে একটি আয়াত নাজিল করেন:
“আর যে কেউ আল্লাহ ও রাসূলের অনুগত হয়, তবে তারা ঐ ব্যক্তিদের সংগী হবে যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন; অর্থাৎ নবীগণ, সত্য সাধকগণ, শহীদ্গণ ও সৎকর্মশীলগণ এবং এরাই সর্বোত্তম সঙ্গী”। সূরা আন-নিসা, আয়াতঃ ৬৯।
সুবহানাল্লাহ, সেই যুবক কতইনা সৌভাগ্যবান যে স্বয়ং আল্লাহ সাত আসমানের উপর থেকে তার প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর মাধ্যমে!! সে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করেছিলো, সে তাঁকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) ভালবেসেছিলো আল্লাহ এর সন্তুষ্টি ও করুনা প্রাপ্তির আশায় যাতে করে সে পরকালে জান্নাত লাভ করতে পারে আর মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর সান্নিধ্য পরকালেও যেন লাভ করতে পারে। তার চিন্তা চেতনার অধিকাংশই পরকালের প্রাপ্তির কথা বিরাজ করছিলো!
কিন্তু আজ আমাদের কি হয়েছে? আমরা অবিশ্বাসীদের রীতি-নীতি আর সংস্কার রপ্ত করার পিছনে মত্ত হয়ে পড়েছি!! মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) কে ভালবেসে তাঁর সুন্নাহ এর অনুসরন করার কথা আমাদের চিন্তা চেতনা থেকে কি করে লোপ পেয়ে গেলো! আমরা মুসলমানরা আজ আল্লাহ এর আদেশ এর প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করছি আর মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর সুন্নাহকে হাত থেকে ছেড়ে দিয়েছি। এভাবে চলতে থাকলে শেষ নিঃশ্বাস এর সাথে সাথে সব কিছুই ব্যার্থ পর্যবসিত হবে তাতে কোন সন্দেহ নাই। আল্লাহ এর বিভিন্ন সতর্কতা মূলক আভাস সম্পর্কে ও বিভিন্ন রকম নিদর্শন সম্পর্কে পড়ছি, জানছি ও প্রত্যক্ষ করছি, অথচ তা থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করছি না, অথবা সেসব আলামত গুলিকে সম্পূর্ণ রূপে উপেক্ষা করছি। কয়েক বছর পূর্বে গাজা উপত্তকায় ইহুদী কর্তীক মুসলমান গণ-হত্যার ঘটনা এবং ইসরায়লের বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলমানদের উপর অমানবিক অত্যাচার নিপীড়ন, সারা বিশ্বের সকল জীবিত মুসলিমদের জন্য যেন ছিলো একটা চপেটাঘাতের মতন। যেন আল্লাহ আমাদেরকে ধারাবাহিকভাবে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যেন আমরা আমাদের শিকড়ে ফিরে যেতে পারি। কিন্তু স্বল্প সময়ের মধ্যে আমরা সকল সতর্কতার বানীই ভুলে যাই।
দুঃখজনকভাবে, আর ক’দিন পরেই গোলাপী ও লাল টেডি বিয়ারগুলিই হবে আমাদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু, তাদেরই রীতি-নীতি ও সংস্কৃতির পদাঙ্ক অনুসরন করার মাধ্যমে যারা মানবতা বিরোধী ও বিশ্বের অপর প্রান্তে আমাদের মুসলমান ভাইদের হত্যাকারী। এই দুঃখজনক চিত্র বুঝা বড় দায়, কি করে আমরা এর পরেও তাদেরকে অনুসরনের মাধ্যমে আনন্দ পেতে পারি?
আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলেন,
“যে অনুকরন করে (অন্য ধর্মালম্বীদের) সে তাদেরই একজন।” (আহমাদ, ২/৫০; আবু দাঊদ, নাম্বারঃ ৪০২১)
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) আরো বলেন,
“তোমরা অবশ্যই তাদেরকে অনুকরন করবে যারা তোমাদের পূর্বেই এসিছিলো (ধীরে ধীরে, ধাপে ধাপে) এমনকি যদি তারা একটা টিকটিকির গর্তেও প্রবেশ করতো, তাহলেও তোমরা তাদেরকে অনুকরন করতে।” তখন সাহাবারা বল্লেন, “ও রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম), আপনি কি ইহুদী ও খৃষ্টানদের কথা বলছেন?” তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) উত্তরে বল্লেন, “তবে আর কার কথা বলছি?” (আল বুখারী)
এটাই কি ঘটছে না আজকের দিনে? আমরা শুধু অন্ধের মত তাদের অনুকরনই করছি না বরং এর জন্য গর্বও করে থাকি। আমাদের ঘুম থেকে উঠে যাওয়ার সময় এখনই। আমাদের অবশ্যই পূর্ণরূপে, হৃদয় দিয়ে আল্লাহ এর ইচ্ছার কাছে আত্নসমর্পন করতে হবে ও তাঁর আদেশ নিষেধ মান্য করতে হবে। আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর সুন্নাহ, সাহাবাদের ও সততার সাধকদের অনুসরন করা আমাদের এখন একান্ত দরকার। কেবল এবং কেবল মাত্র তখনই আমরা সত্যিকার সাফল্য, আনন্দ ও শান্তি লাভ করতে পারবো।
“যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর অবাধ্যতা হতে সাবধান থাকে তারাই সফলকাম।” সূরা নূর, আয়াত ৫২।
মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলেন,
“একজন ব্যাক্তি দুনিয়ার পরের জীবনে তাদের সাথেই অবস্থান করবে যাদের সে দুনিয়াতে ভালবাসে।” (আল-বুখারী)
আল্লাহ যেন আমাদের হৃদয়ে তাদের জন্য ভালবাসা সৃষ্টি করে দেন যারা পরকালে হবেন জান্নাতী। আমীন।

ভালবাসা দিবস সম্পর্কে প্রশ্নত্তোর:-


উত্তর:-
প্রথমত: এটি একটি নব-উদ্ভাবিত বিদ‘আতী দিবস, শরীয়তে যার কোনো ভিত্তি নেই।
দ্বিতীয়ত: এটি অনৈতিক-প্রেম পরিণতির দিকে মানুষকে ধাবিত করে। 
তৃতীয়ত: এর কারণে সালাফে সালেহীনের পথ-পদ্ধতির বিরোধী এরূপ অর্থহীন বাজে কাজে মানুষের মন-মগজ ব্যস্ত করার প্রবণতা তৈরি হয়।
তাই এ-দিনে দিবস উদযাপনের কোনো কিছু প্রকাশ করা কখনও বৈধ নয়; চাই তা খাদ্য-পানীয় গ্রহণ, পোশাক-আশাক পরিধান, পরস্পর উপহার বিনিময় কিংবা অন্য কিছুর মাধ্যমেই হোক না কেন।
আর প্রত্যেক মুসলিমের উচিত নিজ দীন নিয়ে গর্বিত হওয়া এবং অনুকরণপ্রিয় না হওয়া: কেউ করতে দেখলেই সেও করবে, কেউ আহ্বান করলেই তাতে সাড়া দিবে, এমনটি যেন না হয়।
আল্লাহ্‌র নিকট দু‘আ করি, তিনি যেন প্রত্যেক মুসলিমকে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য যাবতীয় ফিতনা থেকে হেফাযত করেন; আর আমাদেরকে তিনি তাঁর অভিভাবকত্ব ও তাওফিক প্রদান করে ধন্য করেন।

ভালবাসা দিবস সম্পর্কে সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদের ফতোয়া:-

ফতোওয়াটি সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদে বিশ্লেষণের পর এই মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়েছে যে, 
কুরআন সুন্নাহর স্পষ্ট প্রমাণাদি দ্বারা এ কথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত যে, ইসলামে ঈদ বা উৎসবের দিন মাত্র দু'টি। সালাফে সালেহীনগণও এ বিষয়ে একমত হয়েছেন। ইসলামে স্বীকৃত ঈদ দুটির একটি হল ঈদুল ফিতর, অপরটি হল ঈদুল আজহা বা কুরবানির ঈদ। উল্লিখিত ঈদ দু'টি ব্যতীত যত ঈদ বা উৎসব আছে, হোক না তা কোন ব্যক্তির সাথে সম্পৃক্ত, বা কোন গোষ্ঠীর সাথে সম্পৃক্ত, বা কোন ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত, তা বিদআত।
মুসলমানদের তা পালন করা বা পালন করতে বলা বৈধ নয় এবং এ উপলক্ষে আনন্দ প্রকাশ করা ও এ ব্যাপারে কিছু দিয়ে সাহায্য করাও নিষেধ। কেননা এ ধরনের কাজ আল্লাহ তা'আলার সীমা লঙ্ঘন বৈ অন্য কিছু হবে না। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করবে সে নিজের উপর অত্যাচার করবে। এ ধরনের কালচার বিধর্মীদের অনুসরনের কল্পে গ্রহণ করা হলে অপরাধ আরো মারাত্বক হবে। কারণ এর মাধ্যমে তাদের সদৃশ্যতা গ্রহণ করা এবং তাদেরকে এক ধরনের বন্ধু বানানো হয়। অথচ আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে এ থেকে বারণ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
من تشبه بقوم فهو منهم
যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাথে সাদৃশ্যতা অবলম্বন করল সে তাদের দলভুক্ত বলে গণ্য।
ভালবাসা দিবস পালন করাও এ নিষেধের অন্তর্ভুক্ত। কেননা এটি খৃষ্টানদের উৎসব। যে মুসলমান আল্লাহ এবং পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে তার জন্য এ কাজ করা দেয়া বা এই দিনে কাউকে ফুল বা অন্যকোনো উপহার দেয়া বৈধ নয়। বরং তার কর্তব্য হল আল্লাহ এবং তার রাসূলের হুকুম পালন করা এবং আল্লাহর শাস্তি ও গযব আসে এমন কাজ থেকে নিজে দূরে থাকা ও অন্যদের দূরে রাখা।
অতএব এ দিবসকে কেন্দ্র করে পানাহার করা, ক্রয়-বিক্রয় করা, কোন কিছু প্রস্তুত করা বা উপঢৌকন দেয়া, চিঠি-পত্র চালাচালি করা ও প্রচার-পত্র বিলি করা অবৈধ। এ সমস্ত কাজের মাধ্যমে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানি করা হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ المائدة2
ফতোয়াটি যারা সত্যায়ন করেছেন :
সৌদি আরবের গবেষণা ও ফতোয়া প্রদান বিষয়ক স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ও সদস্যবৃন্দ:
আব্দুল আযিয বিন আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ আলে শেখ
সদস্য: সালেহ বিন ফাওজান আল-ফাওজান
সদস্য: আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহমান আল-গদইয়ান
সদস্য: বকর বিন আব্দুল্লাহ আবু জায়েদ