ব্যবসা-বাণিজ্য: করনীয় ও বর্জনীয়

হালাল রিযিক আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে মানুষের জন্য বিভিন্নভাবে ব্যবস্থা করে থাকেন। হালাল রিযিক উপার্জন করার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতিকে আল্লাহ তাআলা স্বীকৃতি দিয়েছেন। হালাল জীবিকা উপার্জনের যত পদ্ধতি আছেব্যবসা-বাণিজ্যই এসবের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। পৃথিবীতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে ব্যবসাই উপার্জনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও প্রাধান্যের অন্তর্নিহিত রহস্য সবচেয়ে বেশি ব্যবসা-বাণিজ্যে এ অঙ্গনে যে জাতি যত বেশি মনোযোগী হয়অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তারাই তত বেশি স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে
ইসলাম ব্যবসা-বাণিজ্যকে বিশেষভাবে গুরুত্ব এবং ব্যাপক উৎসাহ দিয়েছে। কুরআন মাজীদে আল্লাহ বলেন,
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَأۡكُلُوٓاْ أَمۡوَٰلَكُم بَيۡنَكُم بِٱلۡبَٰطِلِ إِلَّآ أَن تَكُونَ تِجَٰرَةً عَن تَرَاضٖ مِّنكُمۡۚ ٢٩﴾ [النساء : ٢٩] 
তোমরা একে অপরের ধনসম্পদ অবৈধ উপায়ে আত্মসাৎ করো না। পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করো। [সূরা আন-নিসাআয়াত: ২৯]
একজন মানুষের জন্য তার অপর ভাইয়ের সম্পদ কখনোই বৈধ হয় না। বৈধ হওয়ার একমাত্র উপায় হলো, বিনিময় বা ব্যবসা। উভয়ের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয়, তাতে একে অপরের সম্পদকে নিজের জন্য হালাল করে নিতে পারে এবং অপরের সম্পদের মালিকানা অর্জন করতে পারে। একেই বলা হয় ব্যবসার মাধ্যমে উপার্জন করা বা হালাল রুজী উপার্জন করা।
এ ধরনের উপার্জনকে হাদীসে উত্তম উপার্জন বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যেমন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«أفضل الكسب عمل الرجل بيده، وكل بيع مبرور».
“উত্তম কামাই হলো, একজন মানুষের তার নিজের হাতের কামাই এবং সব ধরনের মাবরুর ব্যবসা-বাণিজ্যের কামাই”[1]
মাবরুর ব্যবসা হলো, যে বেচা-কেনাতে কোনো প্রকার ধোঁকা, খিয়ানত, মিথ্যা ও প্রতারণা থাকে না। পক্ষান্তরে যে ব্যবসার সাথে মিথ্যা, প্রতারণা, ধোঁকা ও খিয়ানতের সংমিশ্রণ ঘটে তাকে মাবরুর বলা যাবে না। এ ধরনের ব্যবসায়ীকে সত্যিকার ব্যবসায়ী বলা যাবে না। কিয়ামতের দিন ফাজের (অপরাধী) লোকদের সাথে হাশরের মাঠে তাদের পূণরুত্থান হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«إِنَّ التُّجَّارَ يُبْعَثُونَ يَوْمَ القِيَامَةِ فُجَّارًا، إِلَّا مَنْ اتَّقَى اللَّهَ، وَبَرَّ، وَصَدَقَ» هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ».
“অবশ্যই ব্যবসায়ীদের কিয়ামতের দিন ফাজের হিসেবেই উপস্থিত করা হবে। তবে যে আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে, সৎ কর্ম করে ও সত্য কথা বলে, তাকে ছাড়া”[2]   
মুমিন ব্যবসায়ীদের গুণাগুণ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
﴿رِجَالٞ لَّا تُلۡهِيهِمۡ تِجَٰرَةٞ وَلَا بَيۡعٌ عَن ذِكۡرِ ٱللَّهِ وَإِقَامِ ٱلصَّلَوٰةِ وَإِيتَآءِ ٱلزَّكَوٰةِ يَخَافُونَ يَوۡمٗا تَتَقَلَّبُ فِيهِ ٱلۡقُلُوبُ وَٱلۡأَبۡصَٰرُ ٣٧ لِيَجۡزِيَهُمُ ٱللَّهُ أَحۡسَنَ مَا عَمِلُواْ وَيَزِيدَهُم مِّن فَضۡلِهِۦۗ وَٱللَّهُ يَرۡزُقُ مَن يَشَآءُ بِغَيۡرِ حِسَابٖ ٣٨﴾ [النور : ٣٧،  ٣٨] 
এমন লোকেরাযাদেরকে ব্যবসা বাণিজ্য ও ক্রয় বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকেসালাত কায়েম করা থেকে এবং যাকাত প্রদান করা থেকে বিরত রাখে না। তারা ভয় করে সেদিনকেযেদিন অন্ত ও দৃষ্টিসমূহ উল্টে যাবে তারা আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করেযাতে আল্লাহ তাদে উৎকৃষ্টতর কাজের প্রতিদান দেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরও অধিক দেন। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অপরিমিত রিযিক দান করেন। [সূরা আন-নূরআয়াত: ৩৭-৩৮]
রাসুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«التَّاجِرُ الصَّدُوقُ الأَمِينُ مَعَ النَّبِيِّينَ، وَالصِّدِّيقِينَ، وَالشُّهَدَاءِ».  
সৎ ও আমানতদার ব্যবসায়ীগণ হাশরের দিন নবী, শহীদ ও সত্যবাদীদের সঙ্গে অবস্থান করার সৌভাগ্য অর্জন করবে[3] 

ব্যবসায়ীদের দুই ধরনের লাভ:
ব্যবসা ব্যবসায়ীদের জন্য দুই ধরণের লাভ বয়ে আনবে। যথা-
এক- দুনিয়াতে ব্যবসার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ দ্বারা সুন্দর জীবন যাপন করার সুযোগ লাভ। দুনিয়ার জীবনকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করা যায়আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿ٱلۡمَالُ وَٱلۡبَنُونَ زِينَةُ ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَاۖ ٤٦﴾ [الكهف: ٤٦] 
“তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দুনিয়ার জীবনের শোভা”। [সূরা কাহাফআয়াত: ৪৬]
অর্থ-কড়ি দুনিয়ার জীবনে অবিচ্ছেদ্য অংশ। অর্থ ছাড়া মানুষ দুনিয়ার জীবন পরিচালনা করতে পারে না। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
﴿ وَلَا تَنسَ نَصِيبَكَ مِنَ ٱلدُّنۡيَاۖ ٧٧ ﴾ [القصص: ٧٧] 
“তবে তুমি দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না”। [সূরা ¬আল-কাসাসআয়াত: ৭৭] দিও কেউ কেউ ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে
দুই- আখিরাতে উত্তম পুরস্কার। ব্যবসা আল্লাহর রাস্তায় আত্মসমর্পণের কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম। ব্যবসা তাকওয়া অনুশীলনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। হারাম হালাল মেনে ব্যবসা করা, সুদ, প্রতারণা ইত্যাদি থেকে বিরত থেকে ব্যবসা করা তাকওয়ার অনুশীলন বৈ আর কি হতে পারে। সালাতের আযান দেওয়ার সাথে সাথে সব ব্যবসা বাণিজ্য ছেড়ে মসজিদে গমন আখিরাতের পুণ্য হাসিলের অনন্য মাধ্যম। সালাত যেমন একটি বিশেষ উপলক্ষ্যযার মাধ্যমে আমরা আমাদে অতীত কর্মকাণ্ডের পোস্টমর্টেম করিআনুগত্যে নবায়ন করিআল্লাহর খাটি বান্দা হওয়ার জন্য বেচে থাকার আশা করিতাকওয়ার প্রার্থনা করি এবং সাহায্য চাই। অন্যদিকে হালাল ব্যবসা করাও আল্লাহর দেয়া শরীয়তের কার্যক্রমের অংশ এবং ব্যাপক ও বিস্তৃত অর্থে অনুরূপ ইবাদাতের শামিল যদি আমরা আমাদে ব্যবসায়িক কাজ আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী করতে পারি

ইসলামে ব্যবসার মূলনীতি

ইসলাম মানুষকে কোন ক্ষেত্রেই বল্গাহীন স্বাধীনতা দেয় নি। সব ক্ষেত্রেই রয়েছে নির্দিষ্ট নীতিমালা। আয়-উপার্জন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম ঘটে নি এ ক্ষেত্রে মৌলিকভাবে ইসলামের দুটি মূলনীতি রয়েছে
এক- ব্যবসায়িক পণ্য, উপাদান ও কায়কারবারগুলো বৈধ হতে হবে। অবৈধ পণ্যের ব্যবসা ও অবৈধ কায়কারবারকে ইসলাম বৈধতা দেয় না।যেমন, মদজুয়াসুদঘুষ ইত্যাদির ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হওয়া ইসলামে অনুমোদন নেই। কারণ, এসব বিষয়কে ইসলামে মৌলিকভাবেই হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। সুতরাং আপনার ব্যবসার সাথে এসবের সংমিশ্রণ আপনার ব্যবসাকে কলুষিত করে।
দুই- ব্যবসা-বাণিজ্য সকল অবস্থায় বৈধ পন্থায় হতে হবে। অর্থাৎ সেখানে কোন ধরনের ধোঁকাবাজিভেজাল ও ফাঁক-ফোকর থাকতে পারবে না। কোনো ধরনের মিথ্যার আশ্রয় থাকতে পারবে না। এ বিষয়ে ইসলামের কয়েকটি দৃষ্টিভঙ্গি আমরা নিম্নে আলোচনা করছি-

১. ব্যবসায় কারো ক্ষতি করা যাবে না:
ব্যবসা দ্বারা মানুষের উপকার করার মানসিকতা থাকতে হবে। কারো ক্ষতি যেন না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম সিদ্ধান্ত দেন যে,
«أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَضَى أَنْ لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ».
নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং অন্যের ক্ষতি করা কোনিই উচিত নয়[4]
ব্যবসা করে গ্রাহকের কাছ থেকে আমরা শুধু লাভ করছি তা নয়; বরং আমরা তাদের জিনি ও সেবা প্রদান করছি। যদি আমরা যৌক্তিক লাভ করে থাকি এবং মনোপলি না করি তবে সমাজের জন্য এটি একটি বড় সহায়তা। ভাল জিনি যৌক্তিক দামে প্রদান করায় সমাজের মানুষ সন্তুষ্ট হবেতাতে আল্লাহ তা‘আলাও আমাদে পর সন্তুষ্ট হবেন
যখন ব্যবসায়ী ও গ্রাহক উভয় পক্ষ অনুভব করবে আমরা উপকৃত হয়েছি তখন সেখানে একটি হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হবে। ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা বন্ধ হয়ে যাবে। যা একটি সুগঠিত সমাজের জন্য প্রয়োজন। এতে উভয় পক্ষই পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার সওয়াব পাবেন

২. ধোঁকাপ্রতারণা ও ফাঁকিবাজি করা যাবে না:
এ ধরনের অপকর্ম ইসলামে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত মন্দ জিনিস ভালো বলে চালিয়ে দেওয়াভালোর সঙ্গে মন্দের মিশ্রণ ঘটিয়ে ধোঁকা দেওয়া ইত্যাদি সম্পূর্ণ হারাম। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّ عَلَى صُبْرَةِ طَعَامٍ فَأَدْخَلَ يَدَهُ فِيهَا، فَنَالَتْ أَصَابِعُهُ بَلَلًا فَقَالَ: «مَا هَذَا يَا صَاحِبَ الطَّعَامِ؟» قَالَ أَصَابَتْهُ السَّمَاءُ يَا رَسُولَ اللهِ، قَالَ: «أَفَلَا جَعَلْتَهُ فَوْقَ الطَّعَامِ كَيْ يَرَاهُ النَّاسُ، مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنِّي».
“একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাজারে গিয়ে একজন খাদ্য বিক্রেতার পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, তিনি খাদ্যের ভিতরে হাত প্রবেশ করে দেখলেন ভিতরের খাদ্যগুলো ভিজা বা নিম্নমান। এ অবস্থা দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে খাবারের পন্যের মালিক এটা কী? লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসূল, এতে বৃষ্টি পড়েছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি সেটাকে খাবারের উপরে রাখলে না কেন; যাতে লোকেরা দেখতে পেত? “যে ধোঁকা দেয় সে আমার উম্মত নয়”[5]

৩. মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া যাবে না:
মিথ্যা অবশ্যই একটি নিন্দনীয় ও বড় ধরনের অপরাধ। ব্যবসার সাথে মিথ্যার সংমিশ্রণ আরও বেশি মারাত্মক ও ক্ষতিকর। কোন মুসলিম সত্যের সঙ্গে মিথ্যার সংমিশ্রণ করতে পারে না। সত্যকে গোপন করতে পারে না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَلَا تَلۡبِسُواْ ٱلۡحَقَّ بِٱلۡبَٰطِلِ وَتَكۡتُمُواْ ٱلۡحَقَّ وَأَنتُمۡ تَعۡلَمُونَ ٤٢﴾ [البقرة: ٤٢]   
তোমরা সত্যের সঙ্গে অসত্যের মিশ্রণ ঘটাবে না। জেনেশুনে সত্য গোপন করো না[6]
একজন মুমিনের দোষ-ত্রুটি থাকা স্বাভাবিক, যা মেনে নেওয়া যায়; কিন্তু একজন মুমিনের মধ্যে মিথ্যা ও খিয়ানতের দোষ থাকাকে কোনোক্রমেই মেনে নেওয়া যায় না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলো,
«أيكون المؤمن جبانًا؟ قال: نعم. قيل: أيكون بخيلاً؟ قال: نعم. قيل: أيكون كذابًا؟ قال: لا».
“একজন মুমিন দুর্বল হওয়া কি স্বাভাবিক? তিনি বললেন, হ্যাঁ- হতে পারে। আবারও জিজ্ঞাসা করা হলো, মুমিন কি কৃপণ হতে পারে? বললেন, হ্যাঁতারপর জিজ্ঞাসা করা হলো, একজন মুমিন মিথ্যুক হতে পারে? বললেন, “না”[7]
হাদীসে একজন মুমিনের অন্যান্য দুর্বলতা বা দোষের কথা স্বাভাবিক বলা হলেও মিথ্যাকে স্বাভাবিক ভাবে মেনে নেওয়া হয় নি।
এ কারণেই তুমি দেখতে পাবে, যে ব্যবসায়ী সত্যবাদী, আমানতদার-মিথ্যা কথা বলে না, খিয়ানত করে না- তার দিকে মানুষ ঝুঁকে পড়ে। তার ব্যবসা দৈনন্দিন উন্নত হতে থাকে। তার দোকানে গ্রাহকের ভিড় বাড়তে থাকে। তার কাছে মানুষ আমানত রাখে, তার সাথে মানুষ লেন-দেন বাড়াতে থাকে। ফলে দেখা যায় সে এক সময় বড় একজন ব্যবসায়ীতে পরিণত হয়। পক্ষান্তরে যে মিথ্যা কথা বলে, মানুষ তার কাছে ভিড়তে চায় না, তার থেকে পলায়ন করে। একে অপরকে বলতে থাকে, তার সাথে তোমরা কোনো ধরনের লেন-দেন করবে না। তার মো‘আমালা সঠিক নয়। ফলে দেখা যায়, ধীরে ধীরে তার ব্যবসা লাভের পরিবর্তে লসের দিকে যায়। মানুষের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা বিলুপ্ত হতে থাকে। মান-সম্মান সব ধুলায় মিশে যায়। তার রিযিকের দরজাগুলো বন্ধ হয়ে যায়। এ জন্যেই আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 
«أربع إذا كن فيك فلا عليك مما فات من الدنياحفظ أمانة، وصدق حديث، وحسن خليقة، وعفة في طعمة»[8].
“চারটি গুণ যখন তোমার মধ্যে থাকবে, তখন দুনিয়াদারী সব খুঁয়ে গেলেও তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আমানত সংরক্ষণ, কথায় সততা, উত্তম চরিত্র, হালাল খাদ্য”।
এ চারটি গুণ এমন, যেগুলো কোনো ব্যবসায়ীর মধ্যে বিদ্যমান থাকলে, অবশ্যই তার ব্যবসার উন্নতি হবে, আল্লাহ তাআলা তার ব্যবসা বাণিজ্যে বরকত দেবেন এবং এ ধরনের ব্যবসায়ী মানুষের নিকট প্রিয় ও গ্রহণযোগ্য হবে। দুনিয়াতেও তার সম্মান বৃদ্ধি পাবে, আখেরাতে তো বটেই; কিন্তু তিক্ত হলেও সত্য, আমরা আমাদের পণ্যগুলো বিক্রির জন্য মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে থাকি। এটি অত্যন্ত গর্হিত কাজ, যা কখনোই কল্যাণ বয়ে আনে না। সাময়িক লাভবান হলেও পরিণতি খুবই করুণ।

৪- ওজনে নিজ স্বার্থরক্ষায় কমবেশি করা যাবে না:
অন্যকে দেওয়ার সময় ওজনে কম দেওয়া আর নেওয়ার সময় বেশি করে নেওয়া জঘন্য অপরাধ। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَيۡلٞ لِّلۡمُطَفِّفِينَ ١ ٱلَّذِينَ إِذَا ٱكۡتَالُواْ عَلَى ٱلنَّاسِ يَسۡتَوۡفُونَ ٢ وَإِذَا كَالُوهُمۡ أَو وَّزَنُوهُمۡ يُخۡسِرُونَ ٣﴾ [المطففين: ١،  ٣] 
ধ্বংস যারা পরিমাপে কম দেয় তাদের জন্য। যারা লোকদের কাছ থেকে মেপে নেয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে। আর যখন তাদেরকে মেপে দেয় অথবা ওজন করে দেয় তখন কম দেয়”। [সূরা আল-মুতাফফিফীনআয়াত: ১-৩]
সুতরাং তুমি যখন কাউকে দেবে তখন কম দেবে না। তুমি যে কাজটি তোমার নিজের জন্য পছন্দ করো না, তা অন্যের জন্য কীভাবে পছন্দ কর। তুমি যখন নিজের জন্য নাও তখনতো তোমাকে মাপে কম দিলে তুমি রাজি হবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ، حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ».
“তুমি তোমার নিজের জন্য যা ভালোবাসো তা অন্যের জন্যও ভালোবাসার আগ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না”।[9]
ু‘আইব আলাইহিস সালাম যে নীতি বর্ণনা করেন, কুরআন তা তুলে ধরছে এভাবে:
﴿وَإِلَىٰ مَدۡيَنَ أَخَاهُمۡ شُعَيۡبٗاۚ قَالَ يَٰقَوۡمِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مَا لَكُم مِّنۡ إِلَٰهٍ غَيۡرُهُۥۖ وَلَا تَنقُصُواْ ٱلۡمِكۡيَالَ وَٱلۡمِيزَانَۖ ٨٤  [هود: ٨٤] 
হে আমার কওম! আল্লাহর ইবাদাত করতিনি ছাড়া তোমাদের কোন মাবুদ নাই। আর পরিমাপে ও ওজনে কম দি না। [সূরা সূরা হূদ,আয়াত: ৮৪]
﴿وَيَٰقَوۡمِ أَوۡفُواْ ٱلۡمِكۡيَالَ وَٱلۡمِيزَانَ بِٱلۡقِسۡطِۖ وَلَا تَبۡخَسُواْ ٱلنَّاسَ أَشۡيَآءَهُمۡ وَلَا تَعۡثَوۡاْ فِي ٱلۡأَرۡضِ مُفۡسِدِينَ ٨٥﴾ [هود: ٨٥] 
আর হে আমার জাতি! ন্যায় নিষ্ঠার সাথে ঠিকভাবে পরিমাপ কর ও ওজন দাও এবং লোকদে জিনিপত্রে কোনরূপ ক্ষতি করো না। [সূরা হূদআয়াত: ৮৫]
অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَأَوۡفُواْ ٱلۡكَيۡلَ إِذَا كِلۡتُمۡ وَزِنُواْ بِٱلۡقِسۡطَاسِ ٱلۡمُسۡتَقِيمِۚ ذَٰلِكَ خَيۡرٞ وَأَحۡسَنُ تَأۡوِيلٗا ٣٥﴾ [الاسراء: ٣٥] 
মেপে দেয়ার সময় পূর্ণ মাপে দেবে এবং সঠিক পাল্লায় ওজন করবে। এটি উত্তম, এর পরিণাম শুভ। [সূরা বনী ঈসরাইলআয়াত: ৩৫]
আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “...যখন কোনো সম্প্রদায়ের লোকেরা ওজনে বা মাপে কম দেয়, তখন শাস্তিস্বরূপ তাদের খাদ্য-শস্য উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং দুর্ভিক্ষ তাদের গ্রাস করে”।[10]
অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, “...যে জাতি মাপে ও ওজনে কম দেয়, তাদের রিযিক উঠিয়ে নেওয়া হয়...”[11]
মনে রাখতে হবে, সালাত, সাওম ইত্যাদি নেক আমলে ত্রুটি হলে আল্লাহ তাআলা হয়তো তা তার নিজের অনুগ্রহে ক্ষমা করে দেবেন; কিন্তু মানুষকে সামান্য অণু পরিমাণ ঠকানো হলে বা অণু পরিমাণ মানুষের হক নষ্ট করলে, এ দায়ভার কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা নিবেন না। কিয়ামতের দিন প্রতারিত ক্রেতাকে ডেকে আল্লাহ তাআলা ওই প্রতারকের আমলনামা থেকে সমপরিমাণ সাওয়াব তাকে দিয়ে দেবেন। প্রতারকের সাওয়াব যদি শেষ হয়ে যায় বা কোন সাওয়াব না থাকে, তবে প্রতারিতদের গোনাহ তাঁর কাঁধের উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। সেদিন কাঁদতে কাঁদতে যদি শরীরের প্রতিটি লোমকূপ থেকে রক্তও প্রবাহিত হতে থাকে, তাতেও কোন কাজ হবে না। সেদিন এমন ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা কোনক্রমেই ক্ষমা করবে না, যদি প্রতারিত ব্যক্তি তাকে ক্ষমা না করেন।

৫-পণ্য বিক্রির জন্য মিথ্যা শপথ করা যাবে না: 
মিথ্যা মানবতাবোধকে লোপ করেনৈতিক চরিত্রের অবক্ষয় ঘটায়। মিথ্যাবাদীর উপর আল্লাহর অভিশাপ। মিথ্যা বলে বা মিথ্যা শপথ করে পণ্য বিক্রি করার পরিণতি খুবই ভয়াবহ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«ثَلَاثَةٌ لَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ: الْمَنَّانُ الَّذِي لَا يُعْطِي شَيْئًا إِلَّا مَنَّهُ، وَالْمُنَفِّقُ سِلْعَتَهُ بِالْحَلِفِ الْفَاجِرِ، وَالْمُسْبِلُ إِزَارَهُ».
“কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তিন ব্যক্তির সাথে কোনো ধরনের কথা বলবেন না, তাদের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করবেন না, তাদের পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। তাদের একজন- যে তার ব্যবসায়িক পণ্যকে মিথ্যা কসম খেয়ে বিক্রি করে”[12]
অপর একটি হাদীসে এ দৃষ্টান্ত এভাবে তুলে ধরা হয়েছে-
«رجل حلف على سلعة بعد العصر، لقد أعطي بها كذا، وكذا، فصدقه المشتري وهو كاذب».
“এক ব্যক্তি আসরের পর তার পণ্য সম্পর্কে কসম খেয়ে বলে, তাকে পণ্যটি এত এত মূল্যে দেওয়া হয়েছে। তার কথা ক্রেতা বিশ্বাস করল, অথচ সে মিথ্যুক”[13]
এ ধরনের ব্যবসায়ীর জন্য উল্লিখিত হাদীসে অত্যন্ত কঠিন ও বেদনাদায়ক শাস্তির কথা বর্ণনা করা হয়েছে।

৬- নিজে ঠকা যাবে না এবং অপরকেও ঠকানো যাবে না:
এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে অভিযোগ করল, যে সে বেচা-কেনাতে প্রতারিত হয় বা ঠকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
«إِذَا أَنْتَ بَايَعْتَ، فَقُلْ: لَا خِلَابَةَ، ثُمَّ أَنْتَ فِي كُلِّ سِلْعَةٍ ابْتَعْتَهَا بِالْخِيَارِ ثَلَاثَ لَيَالٍ».
“যখন তুমি ক্রয়-বিক্রয় করবে, তখন তুমি বলে দিবে যে কোনো প্রতারণা বা ঠকানোর দায়িত্ব আমি নেব না। তোমার জন্য তিনদিন পর্যন্ত পণ্য ফেরত দেওয়ার অধিকার রয়েছে[14]

৮-ব্যবসার সাথে সুদকে মেশানো যাবে না:
সুদ একটি মারাত্মক অপরাধ। সুদ থেকে অবশ্যই দূরে থাকতে হবে। ব্যবসার নামে কোন প্রকার সুদ চালু করা যাবে না। সুদের পরিণতি সম্পর্কেআল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿ٱلَّذِينَ يَأۡكُلُونَ ٱلرِّبَوٰاْ لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ ٱلَّذِي يَتَخَبَّطُهُ ٱلشَّيۡطَٰنُ مِنَ ٱلۡمَسِّۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمۡ قَالُوٓاْ إِنَّمَا ٱلۡبَيۡعُ مِثۡلُ ٱلرِّبَوٰاْۗ وَأَحَلَّ ٱللَّهُ ٱلۡبَيۡعَ وَحَرَّمَ ٱلرِّبَوٰاْۚ ٢٧٥﴾ [البقرة: ٢٧٥] 
যারা সুদ খায় তারা কিয়ামতের দিন দণ্ডায়মান হবে শয়তানের আসরে মোহাবিষ্টদের মতো। কারণ, তারা বলে ক্রয়-বিক্রয় (ব্যবসা) ওতো সুদের মতো, অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। [সূরা আল-বাকারাআয়াত: ২৭৫]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
﴿يَمۡحَقُ ٱللَّهُ ٱلرِّبَوٰاْ وَيُرۡبِي ٱلصَّدَقَٰتِۗ ٢٧٦﴾ [البقرة: ٢٧٦] 
আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এব দান খায়রাতকে বর্ধিত করেন। [সূরা আল-বাকারাআয়াত: ২৭৬]
সুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«مَا أَحَدٌ أَكْثَرَ مِنَ الرِّبَا، إِلَّا كَانَ عَاقِبَةُ أَمْرِهِ إِلَى قِلَّةٍ».
সুদ যদিও বৃদ্ধি পায় কিন্তু এর শেষ পরিণতি হচ্ছে স্বল্পতা[15]
লেনদেন যদি সুদ সংক্রান্ত হয় তবে হাদীসে এসেছে, জাবের ইবন আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে,
«لَعَنَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ آكِلَ الرِّبَا، وَمُؤْكِلَهُ، وَكَاتِبَهُ، وَشَاهِدَيْهِ» ، وَقَالَ: «هُمْ سَوَاءٌ».
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুদ গ্রহণকারীপ্রদানকারীহিসাবকারী এবং সাক্ষী সকলের প্রতি অভিশাপ দিয়েছেন এবং তিনি বলেন তারা সকলেই সমান[16]

৯-অনুমান ভিত্তিক ব্যবসা করা হতে বিরত থাকা:
বৃক্ষস্থিত ফলকে বৃক্ষ হতে আহরিত ফলের বিনিময়ে অনুমান করে বিক্রি করাকে মুযাবানা বলে। বিভিন্ন ধরণের মুযাবানা বর্তমানেও প্রচলিত আছে ক্ষেতে অকীর্তিত খাদ্য শস্য যথা গমবুট ইত্যাদিকে শুকনা পরিষ্কার করা খাদ্য যথা, গমবুট ইত্যাদির বিনিময়ে অনুমান করে বিক্রি করাকে মুহাকালা বলে। সুদের আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগুলোকেও সুদে অন্তর্ভুক্ত করে দেন[17]

১০-অপরের মাল হনন করার চেষ্টা করা যাবে না:
ব্যবসার জটিল মারপ্যাঁচে অন্যের মাল হরণ করা হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَأۡكُلُوٓاْ أَمۡوَٰلَكُم بَيۡنَكُم بِٱلۡبَٰطِلِ إِلَّآ أَن تَكُونَ تِجَٰرَةً عَن تَرَاضٖ مِّنكُمۡۚ ٢٩﴾ [النساء : ٢٩] 
হে ঈমানদারগন তোমরা একে অপরের মাল অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। কেবলমাত্র তোমাদে পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ। [সূরা আন-নিসাআয়াত: ২৯]
হাদসে এসেছে একটি ব্যবসায়িক লেনদেনে উভয় পক্ষই খুঁতসহ পণ্যেও সঠিক বর্ণনা দিতে হবে। ইসলামের বিজনেস কন্ডাক্ট সম্পর্কে জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু এভাবে বর্ণনা করেন রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«رَحِمَ اللَّهُ رَجُلًا سَمْحًا إِذَا بَاعَ، وَإِذَا اشْتَرَى، وَإِذَا اقْتَضَى».
আল্লাহ তার প্রতি দয়া বর্ষণ করুক যে বিক্রির সময়ক্রয়ের সময় এবং অভিযোগের সময় সদয় থাকে[18]

ব্যবসায়ী ভাইদের করনীয়

১. যাকাত দেওয়া:
যখন আমাদে ব্যবসার লাভের কারণে নিসাব পরিমাণ সম্পত্তির মালিক হব, তখন ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি যাকাতের আমল আমাদের দ্বারা পালন হবে। এর মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচন হবে। ধনী ও গরীবের মাঝে সেতু বন্ধন রচনা হবে যাকাত সম্পদের ময়লা-আবর্জনা। যাকাত দিয়ে সম্পদকে ময়লা আবর্জনা থেকে পরিষ্কার করতে হয়। যাকাত কখনো সম্পদ কমায় না। যাকাত সম্পদ বাড়ায়। যাকাত দেওয়া দ্বারা ব্যবসায়ী তার সম্পদকে কলুষমুক্ত করল। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَمَآ ءَاتَيۡتُم مِّن رِّبٗا لِّيَرۡبُوَاْ فِيٓ أَمۡوَٰلِ ٱلنَّاسِ فَلَا يَرۡبُواْ عِندَ ٱللَّهِۖ وَمَآ ءَاتَيۡتُم مِّن زَكَوٰةٖ تُرِيدُونَ وَجۡهَ ٱللَّهِ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُضۡعِفُونَ ٣٩﴾ [الروم: ٣٩] 
“আর তোমরা যে সুদ দিয়ে থাকমানুষের সম্পদে বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য তা মূলতঃ আল্লাহর কাছে বৃদ্ধি পায় না। আর তোমরা যে যাকাত দিয়ে থাক আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে (তাই বৃদ্ধি পায়) এবং তারাই বহুগুণ সম্পদপ্রাপ্ত”। [সূরা রূমআয়াত: ৩৯]
আয়াত দ্বারা স্পষ্ট প্রমাণিত হয়, যাকাত দ্বারাই সম্পদ বৃদ্ধি পায় সুদ নয়। সুদের পরিণতি খুবই করুণ। সুদ পরিহার করা ও তা থেকে দূরে থাকার জন্য আমাদের সর্বাত্মক সতর্ক থাকতে হবে।

২. লেনদেনের ক্ষেত্রে ইসলামের মূলনীতি অনুসরণ করা:
ব্যবসায়িক যে কোন লেনদেন ও কারবারের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলা সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন,
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِذَا تَدَايَنتُم بِدَيۡنٍ إِلَىٰٓ أَجَلٖ مُّسَمّٗى فَٱكۡتُبُوهُۚ وَلۡيَكۡتُب بَّيۡنَكُمۡ كَاتِبُۢ بِٱلۡعَدۡلِۚ﴾ [البقرة: ٢٨٢] 
হে মুমিনগ যখন তোমরা কোন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঋণের আদান প্রদান করতখন তা লিপিবদ্ধ করে নাও এবং তোমাদে মধ্যে কোনলেখক ন্যায়সঙ্গতভাবে তা লিখে দিবে; ...দুজন সাক্ষী কর,...। [সূরা আল-বাকারাআয়াত: ২৮২]

৩. খাদ্যে ভেজাল মেশানো থেকে বিরত থাকা:
খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণকারী লোকদের সমাজের মানুষ ভালো চোখে দেখে না। তাদের বিশ্বাস করে নাঅন্তর থেকে সম্মান করে না। দুনিয়াতে লাঞ্ছনা ও ব্যর্থতা নিজের চোখেই দেখতে পারে। পরকালের কঠিন শাস্তি তো তাদের ভোগ করতে হবেই। ইদানীং শুধু ভেজাল নয়বিভিন্ন আধুনিক নামের বিষও মেশানো হয়। এমনকি ভেজাল ওষুধেরও বাজারে ছড়াছড়ি আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَلَا تَتَبَدَّلُواْ ٱلۡخَبِيثَ بِٱلطَّيِّبِۖ ٢﴾ [النساء : ٢]
এবং তোমরা অপবিত্র বস্তুকে পবিত্র বস্তু দ্বারা পরিবর্তন করো না”। [সূরা আন-নিসাআয়াত: ২]

৪. উপকার করার মানসিকতা পোষণ করা:
যখন ব্যবসায়ী ও গ্রাহক উভয় পক্ষ অনুভব করবে আমরা উপকৃত হয়েছি তখন সেখানে একটি হৃদ্যতা পূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হবে। ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা বন্ধ হয়ে যাবে। যা একটি সুগঠিত সমাজের জন্য প্রয়োজন। এতে উভয় পক্ষই পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার সওয়াব পাবেন

৫. মানব সেবার কাজে মনোযোগ দেওয়া:
ব্যবসা করে গ্রাহকের কাছ থেকে আমরা শুধু লাভ করছি তা নয়; বরং আমরা তাদের জিনি ও সেবা প্রদান করছি। এটি নবীদের সামাজিক কর্মসূচীর মতো। সূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«التَّاجِرُ الصَّدُوقُ الأَمِينُ مَعَ النَّبِيِّينَ، وَالصِّدِّيقِينَ، وَالشُّهَدَاءِ».
সত্যবাদী ও বিশ্বাসী ব্যবসায়ীগ বিচার দিবসে নবীওলী ও শহীদগণের সাথে অবস্থান করবে[19]
ব্যবসায়ীদের খুশি হওয়া উচিৎ যে, তারা অন্যের জন্য চাকুরীর সুযোগ সৃষ্টি করেন। একজনের চাকুরী হওয়ার অর্থ হচ্ছে একটি বেকারত্ব কমল,একজনের হালাল আয়ের পথ প্রশস্ত হলোরাষ্ট্রের মানব সম্পদের উন্নয়ন ঘটল -এ সবই ইসলামের নির্দেশ
মোটকথা, ব্যবসা শুধু আয়-রোজগারে একটি ব্যবস্থার নাম নয়। ব্যবসার সাথে যেমনিভাবে মানুষের জীবন-জীবিকার সম্পর্ক, অনুরূপভাবে রয়েছে সামাজিক, মানবিক ও ইসলামী আদর্শ সহ বিভিন্ন কর্মসূচী ও বাস্তব-ধর্মী পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সত্যিকার ব্যবসায়ী হওয়ার তাওফীক দিন। আমীন।

ইসলামের দৃষ্টিকোণে ঠকবাজি, প্রতারণা ও ওজনে কম দেওয়ার শাস্তি

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য। অসংখ্য সালাত ও সালাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর, তার পরিবার-পরিজন ও সাহাবীগণের উপর।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে প্রতারণা ও প্রতারক, উভয়ের ব্যাপারে কঠোর নিন্দা জ্ঞাপন করেছেন এবং তাদের জন্য অবধারিত ধ্বংসের ঘোষণা দিয়েছেন। এ সংক্রান্ত স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায় পবিত্র কালামের এই আয়াতে : 
“ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়। যারা মানুষের থেকে মেপে নেয়ার কালে পূর্ণ মাত্রায় গ্রহণ করে। আর যখন তাদের জন্য মাপে বা ওজন করে, তখন কম দেয়।”[১]
এ এক কঠিন ঘোষণা, যারা ঠগবাজি করে, মাপে ও ওজনে মানুষকে কম দেয় তাদের জন্য। সুতরাং যারা পুরোটাই চুরি করে, আত্মসাৎ করে, এবং মানুষকে তাদের প্রাপ্য বস্তুতে ঠকায়, তাদের কী কঠিন অবস্থা হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। মাপে ও ওজনে কমপ্রদানকারীর তুলনায় এরা আল্লাহ তাআলার শাস্তির অধিক ভাগিদার, এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।

আল্লাহর নবী শুয়াইব আ. তার সম্প্রদায়কে মানুষকে তার প্রাপ্য বস্তুতে ঠকানো এবং মাপে ও ওজনে কম প্রদানে সতর্ক করেছেন, যেমন আল্লাহ তাআলা তার সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করেছেন।
এমনিভাবে আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতারণা থেকে সতর্ক করেছেন এবং প্রতারকের ব্যাপারে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। 
একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাবারের এক স্তুপের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তিনি খাবারের স্তুপে হাত প্রবেশ করালেন, তার আঙুলগুলো ভিজে গেল। তাই তিনি বললেন, ‘হে খাবারওয়ালা, এটা কি ? সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, তাতে বৃষ্টির পানি পড়েছিল। তিনি বললেন, তুমি কি তা খাবারের উপরে রাখতে পারলে না, যাতে মানুষ তা দেখে ? যে প্রতারণা করে, সে আমার দলভুক্ত নয়।’ অন্য রেওয়ায়েতে আছে ‘যে আমাদের সাথে প্রতারণার আশ্রয় নেয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়’। অপর রেওয়ায়েতে আছে ‘সে আমাদের দলভুক্ত নয়, যে প্রতারণার আশ্রয় নেয়।’[২]
সুতরাং রাসূলের উক্তি ‘আমাদের দলভুক্ত নয়’ প্রতারণার বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট। প্রতারণা, প্রতারণার নোংরা এলাকায় পা বাড়ানো, তার ভয়াবহ ঘেরাটোপে আটকে পড়া থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য এ উক্তিই আমাদেরকে সরল পথ দেখাবে।
হে প্রিয় ভাই, মানুষ যাতে স্বত:স্ফূর্তভাবেই প্রতারণা ও এ সংক্রান্ত যাবতীয় ক্ষেত্রে নিজেকে বাঁচিয়ে চলে এবং এ ব্যাপারে মানুষের পরিবর্তে আল্লাহকেই পর্যবেক্ষক হিসেবে গ্রহণ করে, তাই মানুষের সামনে আল্লাহ তাআলা কর্তৃক এই সতর্কবানী উপস্থাপন করা আমাদের একান্ত কর্তব্য ও দায়িত্ব।
কোন কবি যথার্থই বলেছেন : আত্মার ভিতর থেকেই যদি কোন প্রতিরোধের উপায় না জেগে উঠে, তবে ব্যক্তি কখনোই বক্র পথ থেকে ফিরে আসে না।
প্রিয় ভাই, আমি তোমার সামনে এ বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ একটি স্তরক্রম তুলে ধরছি। ইসলামে প্রতারণার ব্যাপারে কঠোর ঘোষণা সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর, আশা করি, এটি তোমাকে তার বাহ্যিক রূপ বুঝতে সাহায্য করবে।

প্রথম স্তর : প্রতারণার সংজ্ঞা

প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ মুনাভী বলেন : প্রতারণা হচ্ছে ভালোর সাথে মন্দের মিশ্রণ ঘটানো। 
অপর এক হাদীস ব্যাখ্যাকার ইবনে হাজর আল-হায়সামী বলেন : নিষিদ্ধ প্রতারণা হচ্ছে ক্রেতা ও বিক্রেতার ন্যায় পণ্যের কোন মালিক তার পন্যের এমন দোষ সম্পর্কে অবগতি লাভ করা যে, যদি তার গ্রাহক এ সম্পর্কে অবগত হয় তবে সে তা গ্রহণ করতে কোনভাবেই সম্মত হবে না। 
কাফাভী বলেন : প্রতারণা হচ্ছে অন্তরের কালোত্ব, মুখমন্ডলের মলিনতা। এ কারণেই হিংসা ও বিদ্বেষকেও ‘প্রতারণা’ শব্দে বর্ণনা করা হয়।

দ্বিতীয় স্তর : প্রতারণার বাহ্যিক রূপ

আমাদের বর্তমান সামাজিক অবস্থা, মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সর্বোপরি বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক লেনদেন বিবেচনা করলে এ বিষয়টি অত্যন্ত পরিস্কার হয়ে যায় যে, আমরা নানাভাবে প্রতারণা দ্বারা আক্রান্ত হয়ে আছি। এর ভয়াল ছোবল আমাদেরকে ধীরে ধীরে ঘিরে ফেলছে। আমরা কোনভাবেই এর আক্রমণ থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে সক্ষম হচ্ছি না। 

সমাজিক প্রতারণার যে কয়টি বাহ্যিক রূপ সচরাচর আমরা দেখতে পাই, নিম্নে সে সম্পর্কে সংক্ষিপ্তাকারে আলোচনার প্রয়াস পাব।

প্রথমত : কেনা-বেচার ক্ষেত্রে

মুসলমানদের কেনা-বেচায়, তাদের বাজার ব্যবস্থায় প্রতারণা কি প্রকট রূপ ধারণ করেছে, ধীরে ধীরে তা কতটা ভয়াবহ অবস্থায় উপনীত হচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য। প্রতারণার এক ভয়াবহ অবস্থার মাঝে আমরা বসবাস করছি। প্রতারণা দোষ ঢেকে রাখার সমতুল্য গণ্য করা হচ্ছে। প্রতারণা বিভিন্নভাবে এ সমাজে এখন হাজির হচ্ছে, কখনো স্বয়ং পণ্যে প্রতারণা করা হচ্ছে, কখনো তার শাখা-প্রশাখায় কিংবা সংখ্যায়। আবার কখনো তার ওজনে, তার মৌলিক গুণাগুণে, অথবা তার উৎস গোপন করে তাতে প্রতারণার আশ্রয় নেয়া হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত: বিবাহে প্রতারণা

সামাজিক মেল-বন্ধনের পবিত্র একটি অঙ্গ, বিবাহ-শাদিতেও আজকাল প্রতারণার আশ্রয় নেয়া হচ্ছে। এ প্রতারণাগুলোর ধরন ও প্রক্রিয়া মানুষের খুবই নিম্নরুচির প্রকাশ ঘটায়। অহরহ আমরা যে ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছি, তা হচ্ছে, এক বোনকে দেখিয়ে ভিন্ন বোনকে বিয়ে দিয়ে দেয়া হচ্ছে। ছেলে কিংবা মেয়ের দোষ-ত্র“টি গোপন করে বিয়ে দিয়ে দেয়া হচ্ছে। একে মোটেই পাপ মনে করা হচ্ছে না। পাত্রীকে দেখতে চাওয়া হলে পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে এমনভাবে প্রদর্শন করা হচ্ছে, যা মোটেই কাম্য নয়। সাজসজ্জার বাহুল্য করে তার আসল রূপকে ঢেকে রাখা হচ্ছে। ফলে বর প্রতারিত হচ্ছে। এগুলো সমাজের অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে, অথচ মানুষ এর পাপের দিকটির কথা ভুলে যাচ্ছে বেমালুম।

তৃতীয়ত : অপরের জন্য কল্যাণ কামনা ও সততায় প্রতারণা

অপরের জন্য কল্যাণ কামনায় প্রতারণার প্রক্রিয়া হচ্ছে, অপরের জন্য কিছু করতে গিয়ে ইখলাস ও বিশুদ্ধ উদ্দেশ্য রাখা হয় না। তাতে দীনী ও দুনিয়াবী বস্তুগত উদ্দেশ্য হাসিলের পায়তারা করা হয়। মুমিনদের মাঝে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের অবশ্যম্ভাবী দাবী হচ্ছে মুমিন তার অপর মুমিন ভাইয়ের জন্য কিছু করতে গিয়ে নিজেকে পুরোপুরি উজাড় করে দিবে এবং তাতে পুরোপুরি বিশুদ্ধ নিয়ত রাখবে। কারণ, মুমিনদের আকক্সক্ষা হচ্ছে কল্যাণের আকাক্সক্ষা, আর মুনাফিকদের প্রবণতা হচ্ছে প্রতারণার প্রবণতা।
মুমিন তার অপর মুমিন ভাইয়ের জন্য আয়না স্বরূপ, যখন তার মাঝে কোন প্রকার ত্র“টির সন্ধান পাবে, তাকে দূর করবে, শুদ্ধ করে তুলবে তাকে। কল্যাণ কামনা সম্পন্ন হবে মুমিনদের থেকে কষ্ট দূর করা, দীনের ক্ষেত্রে যে ব্যাপারে তারা অজ্ঞ- যা তাদের জানা নেই, তা জানিয়ে দেয়া এবং কথা ও কাজের মাধ্যমে তাদেরকে সহযোগিতা করার মাধ্যমে। তারা কল্যাণ সাধন করবে একে অপরের গোপন বিষয়গুলো গোপন রাখার মাধ্যমে, পারস্পরিক ক্ষতি কাটিয়ে, একজন অপরজনের উপকার সাধন করে। তারা একে অপরকে সৎকাজের আদেশ দিবে, অসৎকাজে বাধা প্রদান করবে। নমনীয়তা, ইখলাস, দয়ার্দ্র আচরণ, বড়কে সম্মান ও ছোটর প্রতি স্নেহশীলতা, উত্তম উপদেশের মাধ্যমে পস্পরে কল্যাণ সাধন, ইত্যাদি হবে তাদের চলার ঐকান্তিক পাথেয়। তারা নিজেদের জন্য যা ভালোবাসে, অপরের জন্যও সে কল্যাণ কামনা করবে। নিজেদের জন্য যা অপছন্দ করে, অপরের জন্য সে অকল্যাণ অপছন্দ করবে।
হাফেয আবুল কাসিম তাবরানী বর্ণনা করেন : জারীর বিন আব্দুল্লাহ আল-বাজালী রা. তার আযাদকৃত দাসকে তার জন্য একটি ঘোড়া কিনে আনার আদেশ দিলেন। সে তার জন্য তিন শত দেরহামে একটি ঘোড়া কিনে আনল। ঘোড়াটি আনার সময় সঙ্গে মালিককেও নিয়ে আসল, যাতে জারীর তার হাতে নগদ মূল্য পরিশোধ করতে পারেন। জারীর ঘোড়ার মালিককে বলল, দেখ অপরের কল্যাণ কামনায় মানুষ কতটা ঊর্ধ্বে উঠতে পারে, তিন শত দেরহামের তুলনায় তোমার ঘোড়াটি অধিক উত্তম। সুতরাং তুমি কি চার শত দেরহামে তা বিক্রি করবে ? সে বলল, হে আবু আব্দুল্লাহ, এটি আপনার ব্যাপার ! অত:পর তিনি বললেন, তোমার ঘোড়াটি তো এর চেয়েও উত্তম, তুমি কি তা পাঁচ শত দেরহামে বিক্রি করবে ? এভাবে তিনি শ শ করে মূল্য বাড়াতে লাগলেন, ঘোড়ার মালিকটিও এতে সন্তুষ্ট হচ্ছিল। এক সময়ে ঘোড়াটির মূল্য দাড়ালো আটশো দেরহামে। তিনি সে দামেই তা ক্রয় করে নিলেন। এ ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তর দিলেন : প্রতিটি মুলসলমানের জন্য কল্যাণ চাওয়ার ব্যাপারে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে বাইআত গ্রহণ করেছি।

চতুর্থত : অধীনস্থদের ব্যাপারে প্রতারণা

মা’কাল বিন য়াসার আল-মুযানী রা. হতে বর্ণিত, তিনি মৃত্যু শয্যায় বর্ণনা করেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলছেন : 
এমন কোন বান্দা নেই, যাকে আল্লাহ অধীনস্থদেরকে দায়িত্ব দিয়েছেন এবং সে মৃত্যু বরণ করেছে অধীনস্থদের ব্যাপারে প্রতারক অবস্থায়, আল্লাহ অবশ্যই তার উপরে জান্নাত হারাম করে দিবেন।[৩]
বুখারীর অপর বর্ণনায় এই শব্দে বর্ণিত হয়েছে যে, 
এমন কোন মুসলমান নেই, যাকে আল্লাহ অধীনস্থদের দায়িত্ব দিয়েছেন অথচ সে তাদেরকে তার কল্যাণ কামনা দ্বারা আগলে রাখেনি, সে কখনোই জান্নাতের ঘ্রাণ পাবে না।
সুতরাং এ হচ্ছে এক কঠিন ঘোষণা, এই ঘোষণার আওতাধীন প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ অধীনস্থদের দায়িত্ব প্রদান করেছেন। হোক সে ছোট কিংবা বড়। পরিবারের সদস্য থেকে রাষ্ট্রপতি, সকলে এর আওতায় পড়বে। অতএব, প্রত্যেকের কর্তব্য হচ্ছে তার অধীনস্থদের প্রতি কল্যাণ কামনা করা, তাদের প্রতি সৎ থাকা, তাদেরকে কল্যাণের পথে উপদেশ-নসীহত প্রদান করা এবং প্রতারণার আশ্রয় না নেয়া।
সুতরাং যে চাকুরীজীবী, তার জন্য আবশ্যক হচ্ছে চাকুরী ক্ষেত্রে সততা প্রদর্শন করা। শরীয়ত মোতাবেক কোন প্রকার প্রতারণা ও ধোকা ব্যতীত বৈধ উপায়ে তার দায়িত্ব পালন করে যাওয়া। সে মানুষের জন্য কাজ করবে ও তাদের উপকার সাধনে কোন প্রকার কার্পণ্য করবে না। সে যেন সর্বদা এই ধারণা মনে বদ্ধমূল রাখে যে, তাকে একদিন অবশ্যই আল্লাহর দরবারে হাজির হতে হবে, তার দায়-দায়িত্ব আল্লাহ বুঝে নিবেন। আল্লাহ তাকে এ দায়িত্ব দিয়েছেন মুসলমানদের কল্যাণ ধারা চির বহমান রাখার উদ্দেশ্যে। প্রতারণার জন্য নয়।
এমনিভাবে, যে পিতা, তার দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে সে তার সন্তান-সন্ততিকে কল্যাণের পথে ধাবিত করার ক্ষেত্রে সর্বদা প্রচেষ্টা চালাবে, তাদের শিক্ষা-দীক্ষা ও তরবিয়তে কোন প্রকার ত্র“টি ও গাফলতি করবে না। বরং সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাবে, যাতে সে নিজেকে ও সন্তানদেরকে জাহান্নামের সেই আগুন হতে রক্ষা করতে পারে, যার জ্বালানী হবে মানুষ ও পাথর, যার পাহারায় থাকবে কঠিন কঠোর ফেরেশতাগণ।
ইবনে কায়্যিম বলেন : কত ব্যক্তি আছে, যে তার সন্তান ও কলিজার টুকরাকে দুনিয়া ও আখিরাতে অভাগা করে তুলছে তার প্রতি অবহেলা ও তার শিক্ষা-দীক্ষা পরিত্যাগের মাধ্যমে। সে ক্রমাগত তাকে তার প্রবৃত্তির অনুসরণে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। সে ভাবছে যে তাকে সম্মান জানান হচ্ছে, অথচ প্রকারান্তরে সে তাকে অসম্মান করছে। তার বদ্ধমূল ধারণা, সে তাকে করুণা করছে, অথচ সে তাকে যুলম করছে। এভাবে সে তার সন্তানকে মানুষ করার সুযোগ হাত ছাড়া করছে, দুনিয়া ও আখিরাতে তাকে সুসভ্য করার, মহত্ত্বম করার শুভ সময় হেলায় হারাচ্ছে। তুমি যদি সন্তানদের উশৃংখলতার একটি নিরীক্ষা চালাও, দেখবে, তার অধিকাংশই পিতার কারণে ঘটে থাকে।

তৃতীয়ত: পরীক্ষার ক্ষেত্রে প্রতারণা

পরীক্ষায় প্রতারণা ও জালিয়াতির অসংখ্য উপায় ও মাধ্যম ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে প্রচলিত। দীনী পরিবেশের অনুপস্থিতি ও দুর্বলতাই এর প্রধানতম কারণ। ঈমানের অনুপস্থিতি, আল্লাহকে হাজির না ভাবার কারণে তারা প্রতিনিয়ত প্রতারণা ও জালিয়াতীর আশ্রয় নিচ্ছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে সাব্যস্ত আছে, তিনি বলেছেন : 
‘যে আমাদের সাথে প্রতারণা করেছে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়’। 
হাদীস বিশারদগণ বলেছেন, যে কোন কাজে-কর্মে প্রতারণা রাসূলের এ উক্তির আওতাভুক্ত। পরীক্ষায় প্রতারণার বিষয়টিও এর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যে কোন বিষয়েই ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতারণা করতে পারবে না, এটি সম্পূর্ণরূপে হারাম বলে গণ্য হবে। এ হাদীসটি এবং সমঅর্থভুক্ত অন্যান্য হাদীস এ ব্যাপারে উত্তম দলীল।’
এ হচ্ছে প্রতারণা ও ঠকবাজির কিছু প্রকাশ ক্ষেত্র ও বাহ্যিক রূপ। বলা যায়, এটি হচ্ছে প্রতারণা ও জালিয়াতির নানাবিধ প্রকাশের ও বাহ্যিক রূপের কিয়দংশ। আমরা একে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যুুক্তিযুক্ত মনে করেছি, যাতে মানুষ সতর্ক হয় এবং আসন্ন বিপদ হতে নিজেকে মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়।
উল্লেখিত কিংবা অনুল্লেখিত যে কোন প্রকার প্রতারণায় যে ব্যক্তি লিপ্ত হয়েছে, তার প্রতি আমাদের করুণ আবেদন হল : হে আমার ভাই, তুমি আল্লাহকে ভয় কর, যাবতীয় গোপন বিষয়ের অধিকারী সর্ববিষয়ে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষক আল্লাহর ব্যাপারে সতর্ক হও, সাবধান হও। তার শাস্তি ও আযাবের কথা স্মরণ কর। এবং জেনে রাখ, দুনিয়া খুবই ক্ষণস্থায়ী, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ে পরকালে হিসাব নেয়া হবে। ভাল বা মন্দ যত ক্ষুদ্রই হোক, পরিণতিতে তা প্রভাব রাখবে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন : 
‘যারা তাদের পশ্চাতে দুর্বল সন্তান-সন্ততি ছেড়ে গেছে, যাদের উপর তারা ভীত, তারা যেন ভয় করে। অতএব, তারা যেন আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে এবং তারা যেন সোজা কথা বলে।’[৪]
যে এই আয়াতে গভীরভাবে চিন্তা করবে সে অবশ্যই তার সন্তানদের ব্যাপারে ভীত হবে এবং মন্দ কর্ম হতে বিরত থাকবে।

তৃতীয় স্তর : প্রতারণার ক্ষতি

প্রতারণার রয়েছে নানাবিধ ক্ষতি, তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে :
১. প্রতারণা মানুষকে জাহান্নামের পথে ঠেলে দেয়, নিক্ষেপ করে তার ভয়াবহ ও স্থায়ী আগুনে।
২. প্রতারণা ব্যক্তির আত্মিক নীচুতা ও মানসিক কলঙ্কের পরিচায়ক। সুতরাং চরম নীচু মানসিকতার অধিকারীই কেবল তা করে থাকে, এবং স্থায়ী ধ্বংসে পতিত হয়।
৩. প্রতারক ক্রমে আল্লাহ ও মানুষ থেকে দূরে সরে যায়।
৪. প্রতারণা দুআ কবুলের পথ বন্ধ করে দেয়।
৫. তা সম্পদ ও বয়সের বরকত ধ্বংস করে দেয়।
৬. তা ঈমানের দুর্বলতা ও কমতির পরিচায়ক।
৭. অব্যাহত প্রতারণা ও জালিয়াতী প্রবণতার ফলে প্রতারক গোষ্ঠীর উপর যালিম ও কাফিরদেরকে চাপিয়ে দেয়া হয়।
ইবনে হাজার হায়সামী বলেন : এ ধরণের মন্দ প্রবণতা অর্থাৎ প্রতারণার ফলে আল্লাহ তাদের উপর যালিমদেরকে চাপিয়ে দেন, ফলে তারা তাদের ধন-সম্পদের ছিনতাইকারীতে পরিণত হয়। তাদের সম্মান হানী করে। এমনকি কখনো কখনো তাদের উপর কাফিরদেরকে চাপিয়ে দেন, তারা তাদেরকে বন্দী করে ফেলে, তাদেরকে দাসে পরিণত করে এবং তাদেরকে আক্রান্ত করে সর্বাত্মক শাস্তি ও সীমাহীন লাঞ্ছনা।
মুসলমানদের উপর কাফিরদের এই আধিপত্য, তাদেরকে বন্দী করা, দাসে পরিণত করা, আধুনিক যুগের এ সকল সমস্যার অধিকাংশ ঘটছে, যখন ব্যবসায়ীরা নানাবিধ প্রতারণার উদ্ভব ঘটিয়েছে, নানা উপায়ে মানুষকে তারা ঠকাচ্ছে, জালিয়াতী করে মানুষকে সর্বস্বান্ত করছে। এ ব্যাপারে তারা আল্লাহ তাআলার ভয় শূন্য হয়ে গিয়েছে। আল্লাহ আমাদেরকে এ থেকে হেফাযত করুন। আমীন।