ভাল মৃত্যুর উপায়

হুসনুল খাতিমা বা ভাল মৃত্যু...

 ভাল মৃত্যু মানে- মৃত্যুর পূর্বে আল্লাহর ক্রোধ উদ্রেককারী গুনাহ হতে বিরত থাকতে পারা, পাপ হতে তওবা করতে পারা, নেকীর কাজ ও ভাল কাজ বেশি বেশি করার তাওফিক পাওয়া এবং এ অবস্থায় মৃত্যু হওয়া। এই মর্মে আনাস বিন মালিক (রাঃ) হতে সহিহ হাদিসে এসেছে তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- 
“আল্লাহ যদি কোন বান্দার কল্যাণ চান তখন তাকে (ভাল) কাজে লাগান।” সাহাবায়ে কেরাম বললেন: কিভাবে আল্লাহ বান্দাকে (ভাল) কাজে লাগান? তিনি বলেন: “মৃত্যুর পূর্বে তাকে ভাল কাজ করার তাওফিক দেন।” [মুসনাদে আহমাদ (১১৬২৫), তিরমিযি (২১৪২), আলবানি ‘সিলসিলা সহিহা’ গ্রন্থে হাদিসটিকে সহিহ সাব্যস্ত করেছেন (১৩৩৪)।

 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: 
“আল্লাহ তাআলা যদি কোন বান্দার কল্যাণ চান তখন সে বান্দাকে ‘আসাল’ করেন। সাহাবায়ে কেরাম বলেন: আসাল কি? তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা বান্দাকে বিশেষ একটি ভাল কাজ করার তাওফিক দেন এবং এই আমলের উপর তার মৃত্যু ঘটান।[সহিহ আহমাদ (১৭৩৩০), আলবানি সিলসিলা সহিহা গ্রন্থে হাদিসটিকে সহিহ ঘোষণা করেছেন (১১১৪)।

 ভাল মৃত্যুর বেশ কিছু আলামত আছে। এর মধ্যে কোন কোন আলামত শুধু মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তি নিজে বুঝতে পারে এবং কোন কোন আলামত অন্যান্য মানুষও জানতে পারে।

দুই:

মৃত্যুকালে বান্দার নিকট তার ভাল মৃত্যুর যে আলামত প্রকাশ পায় সেটা হচ্ছে- বান্দাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অনুগ্রহ লাভের সুসংবাদ দেয়া হয়। এই মর্মে আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
“নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, অতঃপর তাতেই অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় পেও না, চিন্তিত হইও না এবং তোমরা প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ কর।”[সূরা ফুসসিলত, আয়াত: ৩০] 
মৃত্যুকালে মুমিন বান্দাদেরকে এই সুসংবাদ দেয়া হয়। দেখুন: তাফসিরে সাদী, পৃষ্ঠা- ১২৫৬।

 এই মর্মে সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমে এসেছে- যা আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 
“যে ব্যক্তি আল্লাহর সাক্ষাতকে ভালবাসে আল্লাহও তার সাক্ষাতকে ভালবাসেন। যে ব্যক্তির কাছে আল্লাহর সাক্ষাত প্রিয়, আল্লাহর নিকটও তার সাক্ষাত প্রিয়। আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী! আপনি কি মৃত্যুর কথা বুঝাতে চাচ্ছেন? আমরা তো সবাই মৃত্যুকে অপছন্দ করি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: না, সেটা না। মুমিন বান্দাকে যখন আল্লাহর রহমত, তাঁর সন্তুষ্টি, তাঁর জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হয় তখন তিনি আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করাকে ভালবাসেন। আর কাফের বান্দাকে যখন আল্লাহর শাস্তি, তাঁর অসন্তুষ্টির সংবাদ দেয়া হয় তখন সে আল্লাহর সাক্ষাতকে অপছন্দ করে এবং আল্লাহও তার সাক্ষাতকে অপছন্দ করেন।”

 ইমাম নববী (রহঃ) বলেন: “হাদিসের অর্থ হচ্ছে- যখন মানুষের মৃত্যুর গড়গড়া শুরু হয়ে যায়, যে অবস্থায় আর তওবা কবুল হয় না, সে অবস্থার পছন্দ-অপছন্দকে এখানে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। মুমূর্ষু ব্যক্তির কাছে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে পড়ে, তার পরিণতি  কী হতে যাচ্ছে সেটা তার সামনে পরিষ্কার হয়ে যায়।

• ভাল মৃত্যুর আলামত অনেক। আলেমগণ কুরআন-হাদিস খুঁজে এই আলামতগুলো বের করার চেষ্টা করেছেন। এই আলামতগুলোর মধ্যে রয়েছে-

 ১. মৃত্যুর সময় ‘কালেমা’ পাঠ করতে পারা। 
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: 
“যে ব্যক্তির সর্বশেষ কথা হবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ তিনি জান্নাতে প্রবেশ করবেন।” [সুনানে আবু দাউদ, ৩১১৬], সহিহ আবু দাউদ গ্রন্থে (২৬৭৩) আলবানি এই হাদিসকে সহিহ বলেছেন।

 ২. মৃত্যুর সময় কপালে ঘাম বের হওয়া। 
বুরাইদা বিন হাছিব (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি তিনি বলেন: 
“মুমিন কপালের ঘাম নিয়ে মৃত্যুবরণ করে।”[মুসনাদে আহমাদ (২২৫১৩), জামে তিরমিযি (৯৮০), সুনানে নাসায়ি (১৮২৮) এবং আলবানি সহিহ তিরমিযি গ্রন্থে হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]

 ৩. জুমার রাতে বা দিনে মৃত্যুবরণ করা। 
দলিল হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: 
“যে ব্যক্তি জুমার দিনে বা রাতে মৃত্যুবরণ করেন আল্লাহ তাকে কবরের আযাব থেকে নাজাত দেন।”[মুসনাদে আহমাদ (৬৫৪৬), জামে তিরমিযি (১০৭৪), আলবানি বলেছেন: সনদের সবগুলো ধারা মিলালে হাদিসটি সহিহ]

 ৪. আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা। 
দলিল হচ্ছে আল্লাহ তাআলার বাণী: 
“আর যারা আল্লাহর রাহে নিহত হয়,তাদেরকে তুমি কখনো মৃত মনে করো না। বরং তারা নিজেদের পালনকর্তার নিকট জীবিত ও জীবিকাপ্রাপ্ত। আল্লাহ নিজের অনুগ্রহ থেকে যা দান করেছেন তার প্রেক্ষিতে তারা আনন্দ উদযাপন করছে। আর যারা এখনও তাদের কাছে এসে পৌঁছেনি তাদের পেছনে তাদের জন্যে আনন্দ প্রকাশ করে। কারণ, তাদের কোন ভয় ভীতিও নেই এবং কোন চিন্তা ভাবনাও নেই। আল্লাহর নেয়ামত ও অনুগ্রহের জন্যে তারা আনন্দ প্রকাশ করে এবং তা এভাবে যে, আল্লাহ, ঈমানদারদের শ্রমফল বিনষ্ট করেন না।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬৯-১৭১] 
এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: 
“যে ব্যক্তি আল্লাহর রাহে নিহত হয় সে শহিদ এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর রাহে মারা যায় সেও শহিদ।”[সহিহ মুসলিম, ১৯১৫]

 ৫. প্লেগ রোগে মারা যাওয়া। 
দলীল হচ্ছে নবী আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: 
“প্লেগ রোগে মৃত্যু প্রত্যেক ঈমানদারের জন্য শাহাদাত।”[সহিহ বুখারী (২৮৩০) ও সহিহ মুসলিম (১৯১৬)] 
এবং 
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্লেগ রোগ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি তখন তিনি আমাকে জানান যে, “এটি হচ্ছে- আল্লাহর পক্ষ থেকে আযাব। আল্লাহ যাদেরকে শাস্তি দিতে চান তাদের উপর এই রোগ নাযিল করেন। আর আল্লাহ এই রোগ মুমিনদের জন্য রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছেন। যে মুমিন প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে নিজ এলাকাতে অবস্থান করবে, ধৈর্যধারণ করবে, সওয়াবের প্রত্যাশা করবে এবং এই একীন রাখবে যে, আল্লাহ তার জন্য যা লিখে রেখেছেন সেটাই ঘটবে সে ব্যক্তি শহিদের সমান সওয়াব পাবে।” [সহিহ বুখারি (৩৪৭৪)]

 ৬. যে কোন পেটের পীড়াতে মৃত্যুবরণ করা। 
দলিল হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: 
“যে ব্যক্তি পেটের পীড়াতে মৃত্যুবরণ করবে সে শহিদ।” [সহিহ মুসলিম (১৯১৫)]

 ৭. কোন কিছু ধ্বসে পড়ে অথবা পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করা। 
দলিল হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: 
“পাঁচ ধরনের মৃত্যু শাহাদাত হিসেবে গণ্য। প্লেগ রোগে মৃত্যু, পেটের পীড়ায় মৃত্যু, পানি ডুবে মৃত্যু, কোন কিছু ধ্বসে পড়ে মৃত্যু এবং আল্লাহর রাস্তায় শহিদ হওয়া।” [সহিহ বুখারি (২৮২৯) ও সহিহ মুসলিম (১৯১৫)]

 ৮. প্রসবউত্তর প্রসূতির মৃত্যু অথবা গর্ভবতী অবস্থায় নারীর মৃত্যু। 
এর দলিল হচ্ছে আবু দাউদ (৩১১১) কর্তৃক বর্ণিত হাদিস; নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: 
“যে নারী জুমা (বাচ্চা) নিয়ে মারা যায় তিনি শহিদ।”। 
ইমাম খাত্তাবি বলেন: এ হাদিসের অর্থ হচ্ছে- যে নারী পেটে বাচ্চা নিয়ে মারা যায়।[আওনুল মাবুদ] 
ইমাম আহমাদ উবাদা বিন সামেত (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শহিদের শ্রেণীগুলো উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছেন: 
“যে নারী তার গর্ভস্থিত সন্তানের কারণে মারা যায় তিনি শহিদ। সে নারীকে তার সন্তান সুরার (নাভিরজ্জু) ধরে টেনে জান্নাতে নিয়ে যাবে।”[আলবানি ‘জানায়িয’ গ্রন্থে (৩৯) হাদিসটিকে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন] 
সুররা (নাভি): নবজাতকের জন্মের পর ধাত্রী নাড়ী কাটেন এবং সামান্য কিছু অংশ রেখে দেন। যে অংশটুকু রেখে দেন সেটাকে সুররা বা নাভি বলে। আর যে অংশটুকু কেটে ফেলেন সেটাকে সুরার (নাভিরজ্জু) বলা হয়।

 ৯. আগুনে পুড়ে, প্লুরিসি (ফুসফুসের আবরক ঝিল্লির প্রদাহজনিত রোগবিশেষ) এবং যক্ষ্মা রোগে মৃত্যু। 
দলিল হচ্ছে- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 
“আল্লাহর রাহে নিহত হওয়া শাহাদাত, প্লেগ রোগে মারা যাওয়া শাহাদাত, পানি ডুবে মারা যাওয়া শাহাদাত, পেটের পীড়ায় মারা যাওয়া শাহাদাত, সন্তান প্রবসের পর মারা গেলে নবজাতক তার মাকে নাভিরজ্জু ধরে টেনে জান্নাতে নিয়ে যাবে। (সংকলক বলেন, এই হাদিসের জনৈক বর্ণনাকারী বায়তুল মোকাদ্দাসের খাদেম আবুল আওয়াম হাদিসটির অংশ হিসেবে “আগুনে পুড়ে মৃত্যু ও যক্ষ্মা রোগ” এর কথাও বর্ণনা করেছেন।) আলবানি বলেছেন: হাদিসটি হাসান-সহিহ।[সহিহুত তারগিব ওয়াত তারহিব (১৩৯৬)]

 ১০. নিজের ধর্ম, সম্পদ ও জীবন রক্ষা করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করা। 
দলিল হচ্ছে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: 
“যে ব্যক্তি তার সম্পদ রক্ষা গিয়ে মারা যায় সে শহিদ। যে ব্যক্তি তার ধর্ম (ইসলাম) রক্ষা করতে গিয়ে মারা যায় সে শহিদ। যে ব্যক্তি তার জীবন রক্ষা করতে গিয়ে মারা যায় সে শহিদ।”[জামে তিরমিযি (১৪২১)] 
সহিহ বুখারি (২৪৮০) ও সহিহ মুসলিমে (১৪১) আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে তিনি বলেন: আমি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি- 
“যে ব্যক্তি তার সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে মারা যায় সে শহিদ।”

 ১১. আল্লাহর রাস্তায় প্রহরীর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যে ব্যক্তি মারা যায় সেও শহিদ। 
দলিল হচ্ছে সহিহ মুসলিমের হাদিস (১৯১৩): সালমান আলফারেসি (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: 
“একদিন, একরাত পাহারা দেয়া একমাস দিনে রোজা রাখা ও রাতে নামায পড়ার চেয়ে উত্তম। আর যদি পাহারারত অবস্থায় সে ব্যক্তি মারা যায় তাহলে তার জীবদ্দশায় সে যে আমলগুলো করত সেগুলোর সওয়াব তার জন্য চলমান থাকবে, তার রিযিকও চলমান থাকবে এবং কবরের ফিতনা থেকে সে মুক্ত থাকবে।”

 ১২. ভাল মৃত্যুর আরো একটি আলামত হলো- নেক আমলরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা। 
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 
“যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলল এবং এ অবস্থায় তার মৃত্যু হলো সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যে ব্যক্তি কোন একটি সদকা করল এবং এ অবস্থায় তার মৃত্যু হলো সেও জান্নাতে প্রবেশ করবে।” [মুসনাদে আহমাদ (২২৮১৩), আলবানি জানায়িয গ্রন্থে পৃষ্ঠা-৪৩ এ হাদিসটিকে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন। দেখুন কিতাবুল জানায়িয, পৃষ্ঠা- ৩৪।

 এই আলামতগুলো ব্যক্তির ভাল মৃত্যুর সুসংবাদ দেয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা নির্দিষ্টভাবে কোন ব্যক্তির ব্যাপারে এ নিশ্চয়তা দিব না যে, তিনি জান্নাতি। শুধু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাদের ব্যাপারে নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন তারা ছাড়া। যেমন চার খলিফার ব্যাপারে তিনি নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন।

 আল্লাহ আমাদের সকলকে ভাল মৃত্যু দান করুন।

কত দূরত্বের সফর করলে কেউ মুসাফির বলে গণ্য হবে এবং সফরের রুখসত পেতে পারে?

মানুষের দৃষ্টিতে যদি উদ্দেশ্যকৃত স্থানটি সফর হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে তাই তাকে মুসাফির বানাবে। আর তখনই সফরের চারটি রুখসত বা ছাড়ের অধিকারী হবে। সে চারটি বস্তু হচ্ছে: 
- কসর তথা চার রাকা‘আত বিশিষ্ট সালাতকে কসর করে দু’ রাকা‘আত পড়া
- জমা তথা দুই সালাতকে এগিয়ে নিয়ে অথবা পিছিয়ে নিয়ে যে কোনো এক ওয়াক্তে আদায় করা।
- মোজার উপর মাসেহ করা, তিন-দিন তিন-রাত্রি পর্যন্ত। 
- রমযানের দিনের বেলায় সাওম ভঙ্গ করা। 
আর যদি স্থানটি সফরের দূরত্ব কী না এ ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গীগত পার্থক্য দেখা দেয়, অথবা  সন্দেহ হয়, তখন দূরত্বের দিকে খেয়াল করতে হবে। তাই দেখতে হবে যদি তোমাদের যাওয়ার স্থানটি তোমাদের সহর থেকে আশি (৮০) কিলোমিটারের অধিক হয়, তাহলে তোমরা মুসাফির বলে বিবেচিত হবে; আর তখন তোমরা উপরোক্ত চারটি রুখসতের অধিকারী হবে। অর্থাৎ দুই সালাতকে জমা করার সুযোগ, চার রাকা‘আত বিশিষ্ট সালাতকে দু’ রাকা‘আতে কসর করার সুযোগ, মোজার উপর তিন-দিন তিন রাত মাসেহ করার সুযোগ এবং রমযানের দিনের বেলায় সাওম ভঙ্গ করার সুযোগ। 
আর সফর অবস্থায় কোথাও অবতরণ করলেও তোমরা জমা করা এবং কসর করার সুযোগ পাবে, যদিও তোমরা ভ্রমণরত না থাক। কারণ তোমরা তখনও মুসাফির হিসেবেই খ্যাত থাক, সুতরাং তোমরা সফরের চারটি রুখসত ও ছাড়ের সুযোগ লাভের অধিকারী হবে, যদিও কোথাও সাময়িকভাবে অবস্থান করে থাক। যখন তোমরা জামাআতের সাথে তা আদায় করবে। 
এর মধ্যে একটি পার্থক্য এই যে, কসর করা তোমাদের জন্য উত্তম হবে, আর জমা না করা তোমাদের জন্য উত্তম হবে, যদি জমা না করার কারণে কষ্ট অনুভূত না হয়। তবে কষ্ট না থাকলেও জমা করতে দোষ নেই; কারণ তোমাদেরকে তখনও মুসাফিরই বলা হয়ে থাকে।

কসর ও জমা করে সালাত আদায় সম্পর্কে কিছু বিধান

আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর প্রশংসা ও নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দুরূদ পাঠের পর আজকের আলোচনা শুরু করছি। 
ইবাদতের ব্যাপারে একটি মৌলিক নীতি হচ্ছে, প্রতিটি ইবাদতের জন্য শরী‘আতপ্রবর্তক আল্লাহ তা‘আলা একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন যা সে সময়েই আদায় করতে হয়, যদি না সেটাকে তার সময় থেকে বিশেষ আবশ্যকতা বা প্রয়োজনের কারণে বের করে অন্য সময়ে করার ব্যাপারে দলীল-প্রমাণাদি পাওয়া যায়। 
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, 
﴿ ٱلَّذِينَ هُمۡ عَن صَلَاتِهِمۡ سَاهُونَ ٥ ﴾ [الماعون: ٥]  
“যারা তাদের সালাত সম্পর্কে বেখবর” [সূরা আল-মা‘উন, ৫] 
অর্থাৎ তারা সালাতকে তার সময় থেকে পিছিয়ে দেয়। 

অনুরূপভাবে বুখারী, মুসলিম, সুনান গ্রন্থকারগণ, মালেক এবং আহমাদ সহ অন্যান্যগণ আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,
سَأَلْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه و سلم أَىُّ الْعَمَلِ أَفْضَلُ ؟ قَالَ : «‏ الصَّلاَةُ لِوَقْتِهَا »‏ .
“আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, কোন কাজটি সর্বোত্তম? রাসূল বললেন, সময়মত সালাত আদায় করা”। 
কিন্তু হাদীসের দলীল দ্বারাই আবার যে সব রুখসত বা ছাড় দেওয়া হয়েছে তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দু’ সালাতকে জমা করে এক সালাতের সময়ে আদায় করা। 
আর এ জমা করা যোহর ও আসরের মাঝে হয়ে থাকে। সুতরাং যোহরকে দেরী করে আসরের সময়ে নিয়ে যাওয়া অথবা আসরকে এগিয়ে নিয়ে এসে যোহরের সময়ে আদায় করার ছাড় শরী‘আত আমাদেরকে দিয়েছে। 
অনুরূপভাবে এ জমা করার সুযোগ রয়েছে মাগরিব ও ইশার মাঝে, সুতরাং মাগরিবকে দেরী করে ইশার সময়ে নিয়ে গিয়ে দু’টোকে আদায় করা, অথবা ইশাকে এগিয়ে নিয়ে এসে মাগরিবের সময়ে মাগরিবের পরেই আদায় করে নেওয়ার সুযোগ ইসলামী শরী‘আত আমাদেরকে দিয়েছে। 
কিন্তু ফজরের সালাত, আলেমগণের ঐকমত্যে তাকে এগিয়ে নেওয়া কিংবা পিছিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। 
বস্তুত: সফর অবস্থায় দু’সালাত জমা করে আদায় করার মাসআলাটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই এ বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করে থাকে; অনেকেই আবার এর অনেক মাসআলা সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখে না, অথচ বিষয়টির প্রয়োজন অনস্বীকার্য। তাই এখানে এ বিষয়ে কিছু মাসআলার অবতারণা করার প্রয়াস পাবো। 
প্রথমেই এটা জানা দরকার যে, মহান আল্লাহর রহমত, তিনি মুসাফিরের জন্য সালাত জমা তথা একত্র করা বিধিবদ্ধ করেছেন। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ও ছাড়। কারণ মুসাফির এমন কিছু অবস্থা ও পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে থাকেন যাতে প্রতিটি সালাতকে তার নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করা কঠিন হয়ে পড়ে। 
আলেমগণ এ ব্যাপারে ইজমা‘ বা ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে আরাফার দিন যোহর ও আসরকে এগিয়ে নিয়ে যোহরের সময়ে জমা করে আদায় করা শরী‘আতসম্মত। অনুরূপভাবে তারা এ ব্যাপারেও একমত পোষণ করেছেন যে, আরাফার দিন সূর্য ডুবার পর নাহরের রাতে মুযদালিফায় মাগরিব এবং ‘ইশা একত্র করে ইশার সময়ে পড়া শরী‘আতসম্মত। [দেখুন, আল-ইজমা‘ ইবনুল মুনযির, পৃ. ৩৮; মারাতিবুল ইজমা‘ পৃ. ৪৫] 
তবে এর বাইরে অন্য সময়ে সালাত একত্রে আদায় করার ব্যাপারে আলেমগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। 

সালাত একত্র করে পড়ার বিধান

আলেমগণ সফরের কারণে দু’সালাত একত্রে আদায় করার ব্যাপারে মতভেদ করেছেন: 
১. অধিকাংশ আলেম যেমন মালেকী, শাফেয়ী, হাম্বলীগণ এ মত পোষণ করেছেন যে, সফরের কারণে যোহর এবং আসর অনুরূপভাবে মাগরিব ও ইশার সালাতকে একত্রে আদায় করা জায়েয। [আশ-শারহুল কাবীর, ১/৩৬৮; মুগনিল মুহতাজ, ১/৫২৯, কাশশাফুল কিনা‘, ২/৫]
২. হানাফী আলেমগণ বলেন, আরাফা ও মুযদালিফা ব্যতীত দু’ ফরয সালাতকে একত্র করে আদায় করা যাবে না। তবে আকৃতিগতভাবে একত্রিত করা যাবে, আর তা হচ্ছে যোহরকে তার শেষ সময় পর্যন্ত দেরী করে আদায় করা তারপর আসরকে তার প্রথম ওয়াক্তে আদায় করা। [আদ-দুররুল মুখতার ওয়া হাশিয়া ইবন আবেদীন, ১/৩৮১] 

প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত: 
জামহূর তথা অধিকাংশ আলেমগণের মতটি এখানে বিশুদ্ধ। কারণ; এর উপর দলীল প্রমাণাদি রয়েছে; তন্মধ্যে: 
১- আরাফার দিন ও মুযদালিফার রাতে সকলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে দু’সালাতকে একত্রিত করে পড়া জায়েয হওয়া। আর তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অকাট্যভাবে সাব্যস্ত হওয়া। যেমনটি বর্ণিত হয়েছে জাবের রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত দীর্ঘ হাদীসসহ অন্যান্য হাদীসে। [মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮]
২- অসংখ্য হাদীসে বর্ণনা এসেছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বিভিন্ন সফরে একত্রে সালাত আদায় করেছেন। তন্মধ্যে অন্যতম হাদীস হচ্ছে: 
• আবদুল্লাহ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বর্ণিত হাদীস, 
"كان النبي صلى الله عليه وسلم يجمع بين المغرب والعشاء إذا جدّ به السير"
“নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাগরিব ও ইশার সালাতকে একসময়ে পড়তেন, যখন সফর চলমান হতো”। [বুখারী, ১০৫৫; মুসলিম, ৭০৩]
• সাঈদ ইবন জুবাইর রহ. বলেন, ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন,
"أن رسول الله صلى الله عليه وسلم جمع بين الصلاة في سفرة سافرها في غزوة تبوك، فجمع بين الظهر والعصر، والمغرب والعشاء". قال سعيد: فقلت لابن عباس: ما حمله على ذلك، قال: أراد أن لا يحرج أمته
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুকের যুদ্ধের এক সফরে সালাতকে জমা (একত্রিত) করে আদায় করেছেন। সুতরাং তিনি যোহর ও আসর এবং মাগরিব ও ইশাকে একত্র করে আদায় করেছেন। সা‘ঈদ বলেন, তখন আমি ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমাকে জিজ্ঞেস করলাম, তাকে একাজ করতে কিসে উদ্বুদ্ধ করল? তিনি বললেন, তিনি চেয়েছেন তাঁর উম্মত যেন সংকীর্ণতায় না ভোগে।” [মুসলিম, ৭০৫]
বস্তুত সালাতকে একত্রে পড়ার বিধানের দ্বারা ইসলামের সহজ হওয়া এবং মহানুভবতার প্রমাণ। জমা করার হাদীসগুলোকে প্রতিটি সালাত তার নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করার পক্ষে আগত দলীল দ্বারা পরিত্যাগ করার কোনো কারণ নেই। কারণ সফর অবস্থায় সালাত একত্রে আদায় করা সাধারণ মূলনীতির বিপরীতে একটি প্রমাণিত পদ্ধতি। তাছাড়া তখন উভয় সময় সালাত আদায়ের সময়ে পরিণত হয়ে যায়। 

• সালাত একত্রে আদায় করা রুখসত বা ছাড় তবে তা স্থায়ী নিয়ম নয়:
ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, জমা তথা সালাতকে একত্রিত করে আদায় করা সাধারণ নিয়মের পর্যায়ে নয় যেমনটি অনেক মুসাফির মনে করে থাকে যে সফরের নিয়ম হচ্ছে একত্রিত করা, ওযর থাকুক বা না থাকুক। বরং সফরে জমা তথা একত্র করে আদায় করা হচ্ছে রুখসত বা ছাড়। আর সফরে কসর করা হচ্ছে স্থায়ী নিয়ম-নীতি। সুতরাং সে হিসেবে বলা যায় যে, মুসাফিরের জন্য স্থায়ী নিয়ম হচ্ছে চার রাকা‘আত সালাতকে দু’রাকা‘আত আদায় করা, সেখানে ওযর থাকুক বা না থাকুক। পক্ষান্তরে দু নামাযকে একত্রিত করে আদায় করার বিধান প্রয়োজনের তাগিদে এবং রুখসত বা ছাড় হিসেবে দেওয়া হয়েছে। এটা এক ধরনের অপরটি অন্য ধরনের। [আল-ওয়াবিলুস সাইয়্যেব, পৃ. ১৪] 
আর এজন্য মালেকী মাযহাবের লোকদের মতে সফরে দু’ সালাত একত্রে আদায় করা উত্তমের বিপরীত; কারণ প্রত্যেক সালাতকে তার নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠিত করাই হচ্ছে উত্তম। তাই উত্তম হচ্ছে তা না করা। যদি তা করা মাকরূহ নয়। মালেকী মাযহাবের লোকগণ এটাকে ‘জাওয়ায মুস্তাওয়ীত ত্বারফাইন’ বা এমন জায়েয যার উভয় দিক সমান, এ নামে নামকরণ করে থাকে। [মিনাহুল জালীল, ১/৪১৬; শারহুল খুরাশী, ২/৬৭] 
পক্ষান্তরে হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণের মতে, জমা করা মুস্তাহাব নয়, বরং ত্যাগ করাই উত্তম। 

জমা বা একত্রিত করে আদায় করার নিয়ত থাকা কী যরূরী?

অর্থাৎ জমা বা একত্রিত করে আদায় করার জন্য প্রথম সালাত আদায়ের সময়েই জমা করে পড়ার নিয়্যত থাকা যরুরী? 
আলেমগণের মধ্যে এ ব্যাপারে কয়েকটি মত রয়েছে: 
• শাফে‘ঈ ও হাম্বলীদের নিকট যদি দ্বিতীয় সালাতকে এগিয়ে নিয়ে এসে প্রথম ওয়াক্তে দু’সালাতকে একত্রে পড়ে তবে সেখানে দ্বিতীয় সালাতকে আদায় করার নিয়্যত প্রথম সালাত আদায়ের সময়েই থাকতে হবে। অবশ্য যদি প্রথম সালাতকে দেরী করে দ্বিতীয় সালাতের সময়ে নিয়ে যায় তখন প্রথম সালাত আদায়ের সময় দ্বিতীয় সালাতকে একত্রিত করার নিয়্যত লাগবে না। 
সে হিসেবে যদি প্রথম সালাত আদায় করার সময় দ্বিতীয় সালাতকে এগিয়ে নিয়ে আদায় করার নিয়্যত না করে তবে তার জমা বা একত্রিত করে আদায় করা শুদ্ধ হবে না। [রাওদাতুত তালেবীন, ১/৩৯৬; কাশশাফুল কিনা‘ ২/৮]
কারণ কখনও কখনও দ্বিতীয় সালাতকে প্রথম সালাতের সময়ে আদায় করা হয় একত্রিত করার জন্য, আবার কখনও তা করা হতে পারে ভুলবশতঃ। সুতরাং এতদোভয়ের মধ্যে পার্থক্য করার জন্য নিয়্যতের প্রয়োজন অবশ্যম্ভাবী। 
• পক্ষান্তরে মালেকী মাযহাবের আলেমগণের মতে, প্রথম সালাত আদায় করার সময়ে দ্বিতীয় সালাতকে তার সাথে জমা করার নিয়্যত করা ওয়াজিব কিন্তু শর্ত নয়। (আর তা দ্বিতীয় সালাতকে এগিয়ে নিয়ে আসা বা প্রথম সালাতকে দেরীতে আদায় করা উভয় ক্ষেত্রেই সমান) সুতরাং যদি কেউ প্রথম সালাত আদায়ের সময় দ্বিতীয় সালাতকে জমা নিয়্যত করা ছেড়ে দিল, তবে তাতে সালাত বাতিল হবে না। [হাশিয়াতুল আদাওয়ী (১/৩৩৫)]
• আর এক বর্ণনায় ইমাম আহমাদ, ইমাম মুযানী এবং ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, প্রথম সালাত আদায়ের সময় দ্বিতীয় সালাত তার সাথে একত্রিত করার নিয়্যতের বাধ্য-বাধকতা নেই। [আল-মুহাযযাব, (১/১৯৭); আল-ইনসাফ:২/৩৪১] 
ইবন তাইমিয়্যা রহ. বলেন, ‘নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁর সাথীদের নিয়ে দু’ সালাত জমা ও কসর করে আদায় করছিলেন তখন তিনি তার সাথীদের কাউকে জমা ও কসর করার নিয়্যত করার জন্য আলাদা নির্দেশনা দেন নি। বরং তিনি মদীনা থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে বের হয়েছেন এ পুরো সময় তিনি দু’ রাকাআত কসর করেছেন কোনোরূপ জমা করা ব্যতীতই। তারপর তিনি আরাফায় যোহর আদায় করেছেন তখন তিনি সাহাবীগণকে জানিয়ে দেন নি যে, তিনি এর পরেই আসরকে আদায় করে নিতে চান। কিন্তু তিনি আসরও আদায় করলেন আর সাহাবীগণেরও কেউই যোহরের সালাতের পূর্বে আসরকে তার সাথে পড়ার নিয়্যত করেন নি। [মাজমু‘ ফাতাওয়া: ২৪/৫০]
সুতরাং এটাই হচ্ছে প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত। কারণ প্রথম সালাতের সময় দ্বিতীয় সালাতকে তার সাথে আদায় করার নিয়্যত করার বাধ্য-বাধকতার কোনো দলীল পাওয়া যাচ্ছে না, বরং দলীল তার উল্টোটাই প্রমাণ করে।        

• জমা করার সময়ের ব্যাপকতা:

বস্তু জমা করে সালাত আদায় করার বিধানটি দেওয়া হয়েছে মুসলিমদের উপর রুখসত বা ছাড় ও মহানুভবতার জন্য। সুতরাং প্রথম সালাতের শুরু থেকে এ জমা করার সময় দ্বিতীয় সালাতের শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ হবে। 
ইবন তাইমিয়্যা বলেন, সালাতের সময় সাধারণ অবস্থায় পাঁচটি, আর ওযর ও প্রয়োজনের সময় তার সময় তিনটি। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, 
﴿ أَقِمِ ٱلصَّلَوٰةَ لِدُلُوكِ ٱلشَّمۡسِ إِلَىٰ غَسَقِ ٱلَّيۡلِ وَقُرۡءَانَ ٱلۡفَجۡرِۖ﴾ [الاسراء: ٧٨]  
“তোমরা সালাত আদায় করো সূর্য হেলে যাওয়ার পর থেকে রাতের অন্ধকার হওয়া পর্যন্ত এবং ফজরের কুরআন পাঠ”। [সূরা বনী ইসরাঈল, ৭৮] 
আর নিয়মনীতিও এভাবে চলে এসেছে যে ওযরের সময় এ ওয়াক্তগুলোতেই আদায় করত হয়, আর তাই যোহর ও আসরকে সূর্য হেলে যাওয়ার পর থেকে সূর্য ডুবে যাওয়া পর্যন্ত পড়ার বৈধতা রয়েছে। আর মাগরিব ও ইশাকে সূর্য ডুবে যাওয়ার পর থেকে সুবহে সাদিক উদিত হওয়া পর্যন্ত পড়া বৈধ। আর এটাই হচ্ছে দু’ সালাতকে একত্রে আদায় করার বাস্তবতা। [ইবন তাইমিয়্যাহ, শারহুল উমদা, পৃ. ২৩০-২৩১]
আর তাই এটা প্রমাণিত হলো যে, 
- প্রথম সালাতটি আদায় করার সময় দ্বিতীয় সালাতটি তার সাথে জমা করার নিয়্যত থাকা জরুরী নয়। কারণ এর উপর কোনো দলীল নেই।
- মুসাফিরের সালাতের সময় তিনটি, সূর্য হেলে যাওয়ার পর থেকে সূর্য ডুবা পর্যন্ত  যোহর ও আসরের সময়। আর সূর্য ডুবার পর থেকে সুবহে সাদিক উদিত হওয়া পর্যন্ত মাগরিব ও ইশার সময়। আর সুবহে সাদিক উদিত হওয়া থেকে শুরু করে সূর্য উঠা পর্যন্ত ফজরের সময়। 

দু’ সালাত জমা করে আদায় করার জন্য কী সফরের অবস্থায় থাকা শর্ত?

• সফর অবস্থায় জমা করার কথা যারাই বলেছেন, তারা সবাই এ ব্যাপারে একমত যে, জমা করা তখন জায়েয, যখন মুসাফির সালাতের সময়ে সফরে ভ্রমণরত ও রাস্তা অতিক্রমরত অবস্থায় থাকবেন।  
• কিন্তু মুসাফির কোনো শহরে অবস্থানরত অবস্থায় যদি সালাত কসর আদায় করতে থাকেন তখনও কি তিনি দু’ সালাত জমা করে আদায় করতে পারবেন? এ ব্যাপারে আলেমগণের মধ্যে দু’টি মত রয়েছে: 
- ইমাম মালেক, কাযী আবু ইয়া‘লা আল-হাম্বলী, ইবনুল কাইয়্যেম এবং ইবনে তাইমিয়্যার কথা থেকে বুঝা যায় যে তাদের মত হচ্ছে, দু’ সালাতকে জমা করা কেবল সফররত অবস্থাতেই জায়েয, সফরে কোথাও অবস্থান করলে জায়েয নয়। [আল-মুদাওয়ানাহ ১/২০৫, আল-মুবদি‘ ২/১২৫, আল-ওয়াবিলুস সাইয়্যিব পৃ. ১৪, মাজমূ ফাতাওয়া ২০/৩৬০, ২২/২৯০] কারণ আবদুল্লাহ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বর্ণিত হাদীসে তা-ই এসেছে, তিনি বলেন, 
"كان النبي صلى الله عليه وسلم يجمع بين المغرب والعشاء إذا جدّ به السير"
“নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাগরিব ও ইশার সালাতকে একসময়ে পড়তেন, যখন সফর চলমান হতো”। [বুখারী, ১০৫৫; মুসলিম, ৭০৩]
- অন্যদিকে শাফে‘য়ী মাযহাবের আলেমগণ এবং হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ, আর তার সাথে ইমাম মালেক এর একটি মতও রয়েছে, তাদের মতে, যে সফরে সালাত কসর করে পড়া হয় সে সফরেই জমা করা জায়েয। সফর চলমান হোক কিংবা কোথাও অবস্থান করে হোক। তবে সফরের বিধান থেকে বের হয়নি এমন হতে হবে। এর বাইরে যতক্ষণ তাকে মুসাফির বলা হবে ততক্ষণই সে জমা করতে পারবে। [মুগনিল মুহতাজ ১/৫২৯; কাশশাফুল কিনা‘ ২/৫; আল-বায়ান ওয়াত তাহসীল ১৮/১১০] 
ইবন কুদামা বলেন, যদি দু সালাতকে প্রথম সালাতের সময়ে আদায় করতে চায় তবে তাও জায়েয, চাই কোথাও অবতরণকারী অবস্থায় হোক বা সফর চলাকালীন অবস্থায় হোক অথবা এমন কোনো এলাকায় অবস্থানকারী হয় যেখানে অবস্থানের কারণে সালাতকে কসর করে পড়তে বাধা হয় না। এর এটাই আতা ইবন আবি রাবাহ, অধিকাংশ আহলে মদীনা, শাফে‘ঈ, ইসহাক ও ইবনুল মুনযিরের মত। [আল-মুগনী ২/২০১]
বস্তুত এটাই প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত, এর সপক্ষে প্রমাণ হচ্ছে: 
• মু‘আয ইবন জাবাল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত হাদীস, তিনি বলেন, 
"خرجنا مع رسول الله صلى الله عليه وسلم عام غزوة تبوك، فكان يجمع الصلاة، فصلى الظهر والعصر جميعًا، والمغرب والعشاء جميعًا، حتى إذا كان يومًا أخّر الصلاة، ثم خرج فصلى الظهر والعصر جميعًا، ثم دخل، ثم خرج بعد ذلك، فصلى المغرب والعشاء جميعًا"
“আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে তাবুকের যুদ্ধে বের হলাম, রাসূল সালাতে জমা করতেন, সুতরাং তিনি যোহর ও আসরকে জমা করতেন, আবার মাগরিব ও ইশাকেও জমা করতেন। একদিন তিনি সালাত আদায়ে দেরী করলেন, সুতরাং তিনি যোহর ও আসরকে জমা করলেন, তারপর তিনি তার তাঁবুতে প্রবেশ করলেন, তারপর বেশ কিছু পরে বের হলেন অতঃপর মাগরিব ও ইশাকে জমা করে আদায় করলেন।  [মুসলিম, ৭০৬]
ইবন কুদামা বলেন, এ হাদীসটি তাদের কথার উত্তরে স্পষ্ট দলীল ও শক্তিশালী প্রমাণ, যারা বলে থাকেন যে দু’ সালাত কেবল তখনই জমা করা যাবে যখন কেউ ভ্রমণরত অবস্থায় থাকবে; কারণ এটা প্রমাণ করে যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভ্রমণরত অবস্থা ছাড়াও যখন তিনি কোথাও অবতরণ করেছিলেন তখনও জমা করেছেন, তিনি তখন তাঁর তাঁবুতে অবস্থান নিয়েছিলেন, সেখান থেকে তিনি বের হয়েছিলেন এবং দু’সালাতকে জমা করে আদায় করেছেন। তারপর আবার নিজের তাঁবুতে ফিরে গিয়েছিলেন। আর এ হাদীসটি গ্রহণ করা সুনির্দিষ্ট। কারণ হাদীসটি সাব্যস্ত হয়েছে এবং বিধান প্রদানে তা সুস্পষ্ট আর তার বিপরীতে কোনো কিছু নেই। তাছাড়া জমা করা হচ্ছে সফরের রুখসত বা ছাড়সমূহের একটি; সুতরাং তা কেবল ভ্রমণরত অবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট হবে না, যেমনিভাবে কসর ও মাসেহ করার বিধানকে শুধু ভ্রমণরত অবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট করা যায় না। তবে উত্তম হচ্ছে দেরী করার জমা করা, (দ্বিতীয়টির ওয়াক্তে প্রথমটি ও দ্বিতীয়টি পড়া) কারণ এর মাধ্যমে জমা করার ব্যাপারে মতভেদকারীদের মতভেদ থেকে বের হওয়া যায় এবং সকল হাদীসের উপরই আমল করা যায়।” [আল-মুগনী, ২/২০২]
তারপরও মুসাফিরের উচিত নয় যে সে কোনো নগর বা শহরে অবতরণ করা অবস্থায় সালাতকে জমা করে আদায় করাকে তার অভ্যাসে পরিণত করে নিবে। বরং জমা তো তখনই করবে যখন তার প্রয়োজন পড়বে এবং তার উপর প্রত্যেক সালাতকে তার নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করা কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে। 
সুতরাং বুঝা গেল যে, 
- যোহর ও  আসর এবং মাগরিব ও ইশার সালাতকে জমা করে আদায় করা আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসাফিরের জন্য রুখসত বা ছাড় এবং সহজীকরণ আর তা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ।   
- জমা করা হচ্ছে রুখসত বা ছাড়; যা মুসাফির তার প্রয়োজনে কাজে লাগাবে তবে তা এমন সাধারণ নিয়ম নয় যা সর্বদা করতে হবে।
- আলেমগণের প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত অনুযায়ী জমা করার সময় প্রথম সালাত আদায় করার সময়েই জমা করার নিয়্যত থাকা শর্ত নয়।

যে সব কারণে দু’ সালাত জমা করা যায়

যে সব কারণে জমা করার কথা হাদীসের ভাষ্যের উপর ভিত্তি করে আলেমগণ বলেছেন তা হচ্ছে, ভ্রমণ ও বৃষ্টি। তবে কোনো কোনো আলেম অন্যান্য কিছু বিষয়কে বৃষ্টি ও ভ্রমণের অর্থে হওয়ার কারণে এবং ব্যাপকার্থে সেগুলোর অধীন করে জমা করার কথা বলেছেন।
• তন্মধ্যে বৃষ্টির ব্যাপারে হাদীসের নস হচ্ছে, যা বুখারী ও মুসলিম ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণনা করেন, 
أن النبي صلى الله عليه وسلم جمع في المدينة بين الظهر والعصر وبين المغرب والعشاء وزاد مسلم من غير خوف ولا مطر ولا سفر و وقع عند مسلم في هذا الحديث من طريق سعيد بن جبير قال : فقلت لابن عباس لم فعل ذلك ؟ قال : أراد أن لا يحرج أحدا من أمته.
“নিশ্চয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাতে যোহর ও আসরের সালাতকে এবং মাগরিব ও ইশার সালাতকে জমা করে অর্থাৎ একত্রে আদায় করেছেন”। 
মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, কোনো প্রকার ভয় বা বৃষ্টি বা সফর ব্যতীতই। 
মুসলিমের অপর বর্ণনায় সাঈদ ইবন জুবাইর থেকে এসেছে, তিনি বলেন, আমি ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমাকে জিজ্ঞেস করলাম, কেনো রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা করলেন? উত্তরে তিনি বললেন, তিনি চেয়েছেন যেন তাঁর উম্মতের কাউকে সমস্যায় পড়তে না হয়।
• আর সফর সালাত জমা করার একটি কারণ, তার প্রমাণ, বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত, ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত হাদীস, 
«أن رسول الله صلى الله عليه وسلم جمع في حجة الوداع المغرب والعشاء بالمزدلفة»
“নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজ্জের দিন মাগরিব ও ইশাকে মুযদালিফায় জমা করে আদায় করেছেন।” 
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘সালাতকে কসর করে পড়ার বিশেষ কারণ হচ্ছে সফর। সফর ব্যতীত তা করা জায়েয নেই। কিন্তু জমা করে আদায় করা, তার কারণ হচ্ছে প্রয়োজন ও ওযর। সুতরাং যখনই তার প্রয়োজন হবে তখনই জমা করা যাবে সে সফর দীর্ঘ হোক কিংবা সংক্ষিপ্ত। অনুরূপভাবে বৃষ্টি ইত্যাদির জন্য জমা করে আদায় করার বিষয়টি। তদ্রূপ রোগ-ব্যাধি ও অনুরূপ কাজের জন্য জমা করা, তাছাড়া অন্য কারণেও জমা করে আদায় করা যাবে। কারণ এর দ্বারা উদ্দেশ্য উম্মতের উপর থেকে সমস্যা নিরসণ করা। আর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সফরে কোথাও (সাময়িক) অবস্থানকালে জমা করেছেন বলে প্রমাণিত হয় নি তবে কেবল একটি হাদীসে তা এসেছে। আর এ জন্যই জমা করা জায়েয যারা বলেছেন যেমন মালেক, শাফে‘ঈ ও আহমদ তারা সফর অবস্থায় কোথাও সাময়িক অবস্থানকালে জমা করার ব্যাপারে মতভেদ করেছেন। তাদের মধ্য থেকে মালেক ও আহমাদ এক বর্ণনায় তা থেকে নিষেধ করেছেন, আর শাফে‘ঈ ও আহমাদ অন্য বর্ণনায় তা জায়েয বলেছেন। অবশ্য আবু হানিফা আরাফা ও মুযদালিফা ছাড়া আর কোথাও জমা করতে নিষেধ করেছেন। 
সুতরাং সফররত মুসাফিরের জন্য (যিনি কোথাও সাময়িক অবস্থানকারী নন) দু’ সালাত একত্রে জমা করে আদায় করার ব্যাপারে (আবু হানিফা ব্যতীত) অন্যদের কারও মতভেদ নেই। কারণ সফর হচ্ছে আযাবের একটি টুকরো; যেমনটি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে। আর দু’ সালাতকে জমা করে আদায় করার সুযোগ দানের মাধ্যমে সহজীকরণের দ্বারা মুসাফিরের সমস্যা দূর করা হয়েছে। আর তা দীনে ইসলামের একটি সাধারণ নীতির অন্তর্গত, তা হচ্ছে এ উম্মত থেকে সমস্যা ও সংকীর্ণতা দূর করা হয়েছে। আর যেভাবে সফরে কসর করা শরীয়ত নির্দেশিত পন্থা বরং সফর হচ্ছে কসর করার কারণ, তেমনিভাবে জমা করাও জায়েয। যদিও জমা করা হচ্ছে রুখসত বা ছাড় আর কসর হচ্ছে শরীয়তের বিধিবদ্ধ নির্দেশনা, তবুও উভয়টিই উক্ত সাধারণ নীতির অন্তর্ভুক্ত।
তবে যে মুসাফির তার নিজের দেশ ছাড়া অন্য কোথাও সাময়িক অবস্থান নিয়েছে, নিজের বাসস্থান নির্ধারণ না করে, বরং সেখানে প্রয়োজনের খাতিরে অবতরণ করেছে, তারপর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে আবার তার সফর চালিয়ে যাবে, এ মুসাফিরের জন্য কি দু’ সালাত একটির সময়ে জমা করে আদায় করা যাবে এ ব্যাপারে আলেমগণ মতভেদ করেছেন। আবু হানিফা রহ. এর ধরনের জমা করাকে নিষেধ করেছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক আরাফাহ ও মুযদালিফায় জমা করার বিষয়টিকে সে দু’ স্থানের সাথে বিশেষিত বলে প্রকাশ করেছেন। সুতরাং তার মতে অন্য কোথাও জমা করা যাবে না। 
আর শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ. বলেন, ‘আর যখন তা প্রমাণিত হলো, তখন দু’সালাতকে জমা বা একত্রিত করে আদায় করার বিষয়ে এটা বলা যায় যে, তার কারণ হচ্ছে, নুসুক বা হাজ্জ যেমনটি হানাফী আলেমগণ এবং ইমাম আহমদের একদল সাথী বলে থাকেন। আর তা ইমাম আহমদের সরাসরি ভাষ্যের দাবিও বটে। কারণ তিনি মক্কী হাজীকে আরাফার মাঠে কসর করতে নিষেধ করতেন কিন্তু তাকে জমা করতে নিষেধ করতেন না। তাছাড়া ইমাম আহমাদ মুসাফির কর্তৃক সালাত জমা করে আদায় করার ব্যাপারে বলেছেন যে, কসর করার মতই দীর্ঘ সফরে জমা করবে। আর যদি বলা হয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক জমা করার বিষয়টি ছিল হাজ্জের কারণে, তাহলে সেখানে দু’টি মত রয়েছে, এক. আরাফাহ্‌ ও মুজদালিফাহ্‌ ছাড়া কোথাও জমা করা যাবে না, যেমনটি হানাফীগণ বলেছেন। দুই. হাজ্জ ব্যতীত জমা করার অন্যান্য কারণেও জমা করা যাবে যদিও সফর না হয়, আর তা হচ্ছে বাকী তিন ইমামের মত।
আর সত্য হচ্ছে, 
• যখন কেউ সফর-রত অরস্হায় থাকবে, তখন দুই সালাতকে এগিয়ে এনে বা পিছিয়ে নিয়ে জমা করে আদায় করা যাবে।
•  অনুরূপভাবে যখন কেউ সফরে কোথাও সাময়িক অবস্হান করে সেখানেও যদি জমা করে সালাত আদায় করার প্রয়োজন দেখা দেয় তবে তাও করবে। যাতে করে সমস্যা মুক্ত হওয়া যায়। 
• তদ্রূপ মুকীম অবস্থা বা সফর ব্যতীত নিজ জায়গায় অবস্হানকারী ব্যক্তিগণও প্রয়োজনে দু’ সালাতকে জমা করে পড়তে পারেন। 
যেমনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রয়োজন থাকার কারণেই মুজদালিফায় জমা করেছিলেন। অথচ প্রয়োজন না থাকায় মীনায় তা করেননি। যদি প্রয়োজন না থাকলেও তা বৈধ হতো তবে রাসূল সেখানে তা করতেন, কারণ তা করার চাহিদা ও দাবী তো ছিলই অর্থাৎ তিনি সফরে ছিলেন। তারপরও তিনি তা করেন নি, অর্থাৎ সফরে কোথাও অবতরণ অবস্থায় দু সালাত জমা করে আদায় করাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রয়োজন ও আবশ্যকতার সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। 
মোটকথা: মুসাফির কোথাও সাময়িক অবস্থান নিলে সেখানে দু’সালাত জমা করার বিষয়টি প্রয়োজন ও আবশ্যকতার সাথে সম্পৃক্ত, যেমনিভাবে এ জমা করার বিধান মুকীম বা স্থায়ী আবাসস্থলেও প্রয়োজনে করার বিধান শরী‘আতে রয়েছে। কিন্তু সফরে কসর করার বিধান এর ব্যতিক্রম তা স্বাভাবিক নিয়ম, শুধু ছাড় নয়। আর এ জন্যই সফরে কসর করা সর্বাবস্থায় নিয়মসিদ্ধ বিষয়, সফর চলতে থাকুক বা কোথাও সাময়িক অবস্থানে থাকুক। কারণ সাহাবীগণ থেকে তা প্রমাণিত হয়েছে, আর সেটা মারফূ‘ হাদীসের অন্তর্ভুক্ত, উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, 
«صَلَاةُ السَّفَرِ رَكْعَتَانِ وَصَلَاةُ الْجُمُعَة رَكْعَتَانِ وَصَلَاةُ الْأَضْحَى رَكْعَتَانِ وَصَلَاةُ الْفِطْرِ رَكْعَتَانِ تَمَامٌ غَيْرُ قَصْرٍ عَلَى لِسَانِ نَبِيِّكُمْ»
“সফরের সালাত দু’ রাকা‘আত, ঈদুল আদহার সালাত দু’ রাকাআত, ঈদুল ফিতরের সালাত দু’ রাকাআত, এগুলো তোমাদের নবীর মুখ নিঃসৃ্ত পরিপূর্ণ সালাত, কসর সালাত নয়।” 
অনুরূপভাবে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন, 
«الصَّلَاةُ أَوَّلُ مَا فُرِضَتْ رَكْعَتَيْنِ فَأُقِرَّتْ صَلَاةُ السَّفَرِ وَأُتِمَّتْ صَلَاةُ الْحَضَرِ»
“সালাত যখন প্রথম ফরয হয়েছিল তখন দু’ রাকা‘আতই ফরয হয়েছিল, অতঃপর সফরের সালাতকে স্থির রাখা হয়েছে আর অবস্থানের সালাতে পূর্ণতা আনা হয়েছে”।
ইমাম যুহরী বলেন, আমি ‘উরওয়াকে বললাম, তবে যে আমি স্বয়ং আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকেই সফরে পূর্ণ সালাত আদায় করতে দেখেছি? তখন উরওয়া জবাবে বললেন, আয়েশা সে ব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়েছেন যে ব্যাখ্যার আশ্রয় উসমান নিয়েছেন (অর্থাৎ তিনি হয়ত সেখানে অবস্থানের নিয়ত করেছেন)। 
তদ্রূপ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, 
«صَلَاةُ السَّفَرِ رَكْعَتَانِ مَنْ خَالَفَ السُّنَّةَ كَفَرَ»
“সফরের সালাত দু’ রাকাআত, যে কেউ সুন্নাতের বিরোধিতা করবে সে কাফের হয়ে যাবে”।